সিএনএম ডেস্কঃ
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ইতিহাস গড়েছেন মিশিগানের ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল আল-সায়েদ। নির্বাচনে জয়ী হয়ে দেশটির ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হচ্ছেন তিনি। চিকিৎসক থেকে রাজনীতিতে আসা ৪২ বছর বয়সী এই প্রার্থীকে ঘিরে এবার বেশ আলোচনা হয়েছে।
নির্বাচনি প্রচারণায় নানা বিতর্ক, সমালোচনা ও ক্রমাগত রাজনৈতিক আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছে তাকে। বিশেষ করে তার ধর্মীয় পরিচয়, ইসরায়েলবিষয়ক অবস্থান এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীরা প্রশ্ন তুলেছেন।
তবে এসব বিতর্কের মধ্যেও নিজের নির্বাচনি প্রচারণা চালিয়ে গেছেন আল-সায়েদ। ভোট গণনায় এগিয়ে থাকার পর একপর্যায়ে নিজের বিজয় দাবি করে সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন তিনি।
আবদুল আল-সায়েদের জন্ম ১৯৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ডেট্রয়েটের উপশহর রচেস্টার হিলসে। তিন বছর বয়সে তার মা-বাবার বিচ্ছেদ হয়। এরপর বাবা ও সৎমা জ্যাকুলিন জনসনের কাছে বড় হন তিনি।
তিনি মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয় ও কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। চিকিৎসাবিদ্যায় ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি মহামারিবিদ্যায় বিশেষজ্ঞতা অর্জন করেন।
২০১৫ সালে ডেট্রয়েটের স্বাস্থ্য বিভাগের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান আল-সায়েদ। তার এ নিয়োগ তখন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সংবাদমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
তিন বছর পর, ২০১৮ সালে মিশিগানের গভর্নর পদে নির্বাচনে অংশ নেন। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রাইমারি নির্বাচনে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। তবে গ্রেচেন হুইটমারের কাছে ২০ শতাংশের বেশি ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। পরে হুইটমার দুই মেয়াদে মিশিগানের গভর্নর নির্বাচিত হন।
২০২৬ সালের সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মনোনয়ন পাওয়ার লড়াইয়েও আলোচনায় ছিলেন আল-সায়েদ।
প্রাথমিক নির্বাচনে হ্যালি স্টিভেন্সকে অল্প ব্যবধানে হারিয়ে দলীয় মনোনয়ন পান তিনি। তবে এরপর স্টিভেন্স রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে সমর্থন দেওয়ার ঘোষণা দেন। এতে নির্বাচনি প্রচারণায় নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়।
মিশিগানের গভর্নর গ্রেচেন হুইটমারও প্রাথমিক নির্বাচনে স্টিভেন্সকে সমর্থন করেছিলেন। তবে আল-সায়েদ মনোনয়ন পাওয়ার পর তার প্রচারণার প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানান।
আল-সায়েদের পক্ষে সমর্থন দিয়েছেন প্রগতিশীল রাজনীতিক সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স ও কংগ্রেস সদস্য আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাসহ মধ্যপন্থি ডেমোক্র্যাট নেতারাও তার প্রচারণায় সমর্থন জানিয়েছেন।
কারণ, মার্কিন সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে মিশিগানের আসনটি ডেমোক্র্যাটদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
আল-সায়েদ বামঘেঁষা রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে নির্বাচনি প্রচারণা চালিয়েছেন। তার প্রতিশ্রুতির মধ্যে ছিল সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং এ খাতে অর্থায়নের জন্য ধনকুবেরদের ওপর কর বাড়ানো।
এ ছাড়া ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা দেওয়ারও সমালোচনা করেছেন তিনি।
২৯ অক্টোবর এক নির্বাচনি সমাবেশে আল-সায়েদ বলেন, কর দেওয়ার পর সেই অর্থ অন্য দেশের মানুষ ও তাদের সন্তানদের ওপর বোমা ফেলার পরিবর্তে নিজের দেশের নাগরিকদের কল্যাণে ব্যয় হওয়া উচিত।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে গণহত্যা বলেও অভিহিত করেছেন তিনি। তবে ইসরায়েল এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
অধিকৃত পশ্চিম তীরেও ইসরায়েল বর্ণবৈষম্য চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন আল-সায়েদ।
তিনি প্রায়ই বলেন, বিদেশে সামরিক কর্মকাণ্ডে অর্থ ব্যয় না করে যুক্তরাষ্ট্রের করের অর্থ স্কুল, শিক্ষা ও মানুষের সুযোগ তৈরিতে ব্যবহার করা উচিত।
২৮ অক্টোবর এক বক্তব্যে তিনি বলেন, সাধারণভাবে বিদেশি সামরিক বাহিনীকে অর্থায়নের পক্ষে নন তিনি। এ ক্ষেত্রে ইসরায়েল, মিশর, সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কথাও উল্লেখ করেন।
ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের আক্রমণের মুখে
আল-সায়েদের নির্বাচনি প্রচারণায় ধর্মীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে একাধিকবার আক্রমণ করেছেন রিপাবলিকান নেতারা।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে সন্ত্রাসীদের পক্ষ নেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন।
১৫ অক্টোবর রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সের এক নির্বাচনি সমাবেশে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও আল-সায়েদের সমালোচনা করেন।
তিনি বলেন, মিশিগানের ভোটাররা এমন ব্যক্তির চেয়ে ভালো প্রতিনিধি পাওয়ার যোগ্য, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কৃতজ্ঞতা দেখান না।
রজার্স অবশ্য ট্রাম্পের মন্তব্য থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছেন। তবে তিনিও আল-সায়েদের নির্বাচনি প্রচারণায় উগ্রপন্থি ও চরমপন্থি সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দাতাদের অর্থায়ন থাকার অভিযোগ তুলেছেন।
রিপাবলিকানরা আল-সায়েদের সঙ্গে মিশরের ইসলামপন্থি সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডের সম্পর্ক থাকার অভিযোগও করেছে। সংগঠনটি ২০১১ সালের আরব বসন্তের পর অল্প সময়ের জন্য মিমরের ক্ষমতায় ছিল।
তবে আল-সায়েদ এ ধরনের সম্পর্কের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
প্রতিদ্বন্দ্বীরা ২০১২ সালে একটি খোলা চিঠিতে তার স্বাক্ষরের বিষয়টিও সামনে এনেছেন। ওই চিঠিতে তৎকালীন মিশরীয় প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে গণমাধ্যম ও পুলিশে সংস্কারের আহ্বান জানানো হয়েছিল।
৯/১১ নিয়ে মন্তব্য করা ভাষ্যকারের সঙ্গে সম্পর্ক
বামপন্থি ভাষ্যকার হাসান পাইকারের সঙ্গে সম্পর্কের কারণেও সমালোচনার মুখে পড়েছেন আল-সায়েদ।
পাইকার একবার মন্তব্য করেছিলেন, ৯/১১ হামলার শিকার হওয়ার যোগ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র। এ মন্তব্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে।
এ ছাড়া গত আগস্টে ডেট্রয়েটের একটি সিনাগগে এক আরব-আমেরিকানের সহিংস হামলার উদ্দেশ্য নিয়ে মন্তব্য করার পর মিশিগানের ইহুদি সম্প্রদায়ের কাছে ক্ষমা চান আল-সায়েদ।
দ্য জিউইশ ইনসাইডারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার প্রার্থিতার কারণে মিশিগানের ইহুদি ভোট বিভক্ত হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে এ ভোটের বড় অংশ ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে যায়। তবে সম্প্রদায়ের কয়েকজন নেতার বক্তব্যের ভিত্তিতে সংবাদমাধ্যমটি রিপাবলিকান প্রার্থীর দিকে ভোটের ঝোঁক বাড়ার পূর্বাভাস দিয়েছিল।
নির্বাচনি প্রচারণায় নিজের ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত পরিচয়ের চেয়ে রাজনৈতিক কর্মসূচিকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন আল-সায়েদ।
তিনি বলেছেন, তার আনুগত্য যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রতি। ভোটারদের তার অতীত কিংবা ধর্মীয় পরিচয়ের পরিবর্তে নীতিগত অবস্থান বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
এক বক্তব্যে আল-সায়েদ বলেন, তার নাম বা বিশ্বাসের কারণে মানুষের জীবনযাত্রার সমস্যা তৈরি হয়নি। মানুষের সমস্যা হলো, তারা প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে পারছেন না, চিকিৎসকের কাছে যেতে পারছেন না এবং যে বাতাসে শ্বাস নেন বা যে পানি পান করেন, তা নিয়েও উদ্বিগ্ন।
তিনি আরও বলেন, ‘আমি হয়তো গড় আমেরিকানের চেয়ে কিছুটা ভিন্নভাবে প্রার্থনা করি, কিন্তু আমরা একই জিনিসের জন্য প্রার্থনা করি।’
ভোট গণনায় এগিয়ে থাকার পর সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে আল-সায়েদ তার বিরুদ্ধে পরিচালিত প্রচারণাকে জীবদ্দশায় দেখা সবচেয়ে কদর্য প্রচারণাগুলোর একটি বলে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে সমর্থকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
এর আগে ১ নভেম্বর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, মিশিগানের প্রায় এক কোটি মানুষের জন্য আরও ভালো কিছু করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, যাদের কথা খুব বেশি বলা হচ্ছে না, তাঁদের জীবনমান উন্নয়নের দিকেই বেশি মনোযোগ দিতে চান তিনি।
Reporter Name 






















