সিএনএমঃ
যশোরের দুটি যৌনপল্লীতে প্রায় ৩০ শিশু রয়েছে, যাদের জন্ম নিবন্ধন সম্ভব হচ্ছে না। জন্ম নিবন্ধনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংকটে এই নিবন্ধন সম্ভব হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
যশোরের বড় বাজারে দু’টি যৌনপল্লী রয়েছে। একটি মাড়োয়ারি মন্দির পতিতালয়; অন্যটি বাবুবাজার পতিতালয়। দুই যৌনপল্লীর ৫টি গলির বাসিন্দার সংখ্যা দুই শতাধিক। এর মধ্যে যৌনকর্মীর সংখ্যা ১২০ জন। এদের অনেকেরই নেই জন্ম নিবন্ধন এবং জাতীয় পরিচয়পত্র। ফলে তাদের সন্তানদের জন্ম নিবন্ধনের ক্ষেত্রে পড়তে হয় বিড়ম্বনায়।
জন্ম নিবন্ধন প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ যেসব কাগজপত্র ও নিয়মকানুনের কথা বলেন, তা সমাজের এই অবহেলিত-নিগৃহীত জনগোষ্ঠীর পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব হয় না। ফলে রাষ্ট্রীয় সেবাপ্রাপ্তির জন্য অত্যাবশ্যকীয় এই জন্ম নিবন্ধন থেকে বছরের পর বছর বঞ্চিত হচ্ছে তারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যশোরের মাড়োয়ারি ও বাবু বাজার যৌনপল্লীর বাসিন্দাদের প্রায় ৩০টি সন্তান রয়েছে যাদের জন্ম নিবন্ধন করা সম্ভব হয়নি। এদের অধিকাংশেরই মায়ের জন্ম নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র নেই। এছাড়া পিতারও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের সংকট রয়েছে। ফলে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় এদের জন্ম নিবন্ধনের সুযোগ নেই। বিশেষ প্রক্রিয়ায় জন্ম নিবন্ধনের জন্য অত্যাবশ্যকীয় যেসব কাগজপত্র বা মেডিকেল সার্টিফিকেট প্রয়োজন তাও জোগাড় করা সমাজের এই অবহেলিত-নিগৃহীত জনগোষ্ঠীর পক্ষে প্রায় অসম্ভব। ফলে এই শিশুরা জন্ম নিবন্ধনহীনভাবে অনিশ্চিত ভবিষ্যত সামনে নিয়ে বড় হচ্ছে।
বাবু বাজার যৌনপল্লীর বাসিন্দা ছালমা আক্তার জানান, প্রায় দশবছর তিনি এই যৌনপল্লীতে বসবাস করছেন। তার নিজের কোনো জন্ম নিবন্ধন বা জাতীয় পরিচয়পত্র নেই। তার ছেলে পিয়াস আহম্মেদের ৮ বছর। তার নিজের কোনো কাগজপত্র না থাকায় ছেলেও জন্ম নিবন্ধন করতে পারেননি।
একই পরিস্থিতি নাজমা খাতুনেরও। তার নিজের জন্ম নিবন্ধন বা জাতীয় পরিচয়পত্র নেই। ফলে ছেলে জাহিদ হাসানের টিকা কার্ড থাকলেও জন্ম নিবন্ধন করা সম্ভব হয়নি।
বে যৌনপল্লীর বাসিন্দা রত্না (ছদ্মনাম) জাতীয় পরিচয়পত্র আছে। কিন্তু জন্ম নিবন্ধন বা অন্যকোনো কাগজপত্র না থাকায় তার দুই সন্তান পাপন ইসলাম (১৪) ও শাওন ইসলামের (৭) (ছদ্মনাম) জন্ম নিবন্ধন হচ্ছে না।
দেশের বিভিন্ন যৌনপল্লীতে বসবাস করা বিউটি (ছদ্মনাম) ৭টি সন্তানের মধ্যে একটিই জীবিত রয়েছে। বিউটি সেই সন্তান পলাশ হোসেনকে (ছদ্মনাম) বাবু বাজার যৌনপল্লীতে বসবাস করেন। শিউলির জাতীয়পত্র আছে। কিন্তু ছেলে পলাশের বয়স ২০ বছর হয়ে যাওয়ায় তারও জন্ম নিবন্ধন হয়নি।
বিউটি খাতুন বলেন, তার ছেলে জন্ম নিবন্ধন করার জন্য অনেক চেষ্টা করেছেন। কিন্তু মেডিকেল সার্টিফিকেটসহ নানান কাগজপত্র চায়। সে সব জোগাড় করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। তাই ছেলের জন্ম নিবন্ধন করতে পারেননি।
পলাশ হোসেন জানান, তিনি মায়ের সাথে থেকে অন্যদের ফাই-ফরমায়েশ খাটেন। তার জন্ম নিবন্ধন হয়নি। এই নিবন্ধন করা তাদের জন্য অনেক ঝামেলার কাজ বলে তিনি মনে করেন।
যশোরে যৌনকর্মীদের অধিকার নিয়ে কাজ করে উন্নয়ন সংস্থা বঞ্চিতা যশোর। বঞ্চিতার নির্বাহী পরিচালক নূর নাহার রানু বলেন, যশোরের দুটি যৌনপল্লীতে প্রায় ৩০ জনের মতো শিশু রয়েছে, যাদের জন্ম নিবন্ধন হয়নি। এই শিশুরা যেহেতু জন্মগ্রহণ করেছে, তাই তাদের জন্ম নিবন্ধন পাওয়ার অধিকার আছে। কিন্তু যেহেতু এরা বিশেষ শিশু। এদের পিতার কোনো কাগজপত্র নেই। মায়েদের অধিকাংশেরই জন্ম নিবন্ধন বা জাতীয় পরিচয়পত্র নেই। তাই বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে এই শিশুদের জন্ম নিবন্ধন করে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
বঞ্চিতা যশোরের সভাপতি মমতাজ বেগম জানান, তারা এই শিশুদের জন্ম নিবন্ধনের জন্য দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করছেন। প্রশাসনের সহযোগিতায় কিছু কিছু শিশুর জন্ম নিবন্ধন হয়েছে। তবে এখনও প্রায় ৩০টি শিশু রয়েছে, যাদের জন্ম নিবন্ধন সম্ভব হয়নি। বাবা-মায়ের জন্ম নিবন্ধন বা জাতীয় পরিচয়পত্রের অপ্রাপ্যতার পাশাপাশি সন্তানদের কারো কারো বয়স বেশি হলে বয়স নির্ধারণের জন্য মেডিকেল সার্টিফিকেটেরও প্রয়োজন রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রক্রিয়াটি এই জটিল হওয়ায় এই শ্রেণির মানুষ হতাশ হয়ে পিছিয়ে যান।
জন্ম নিবন্ধনের দায়িত্বে থাকা যশোর পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা উত্তম কুমার কুন্ডু বলেন, জন্ম নিবন্ধনের জন্য কিছু প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে। নাম ঠিকানার জন্য মায়ের স্কুল বা স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানের প্রত্যয়ন দিয়ে পৌরসভা থেকে একটি সনদপত্র নিয়ে সিভিল সার্জন অফিসের মাধ্যমে ডাক্তারি পরীক্ষা সম্পন্ন করে মেডিকেল সার্টিফিকেট নিতে হবে। এর মাধ্যমে মায়ের জন্ম নিবন্ধন করে পিতার কাগজপত্র না থাকলে ‘নো প্যারেন্টস’ অপশন ব্যবহার করা যেতে পারে। সেই সাথে সন্তানের টিকাকার্ড বা বয়স নির্ধারণের কাগজযুক্ত করে জন্ম নিবন্ধন করা সম্ভব হবে। তবে জন্ম নিবন্ধন যেহেতু খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং একটি স্থায়ী বিষয়। এজন্য কাগজপত্রের এই আইনগত বাধ্যবাধকতা প্রতিপালনও জরুরি।
Reporter Name 
























