ঢাকা ১০:৪৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মানুষের কলিজা ‘খেকো’ খলিলুল্লাহর ভয়ঙ্কর ইতিহাস !

  • Reporter Name
  • আপডেট সময় ০৫:২৬:২৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬
  • ১৪ বার পড়া হয়েছে

মানুষের কলিজা ‘খেকো’ খলিলুল্লাহর ভয়ঙ্কর ইতিহাস !

১৯৭৫ সালের ৩ এপ্রিল। দৈনিক বাংলার একটি বক্স নিউজ পড়ে শিউরে ওঠে গোটা বাংলাদেশ। ছবিতে দেখা যায় এক যুবক মরা একটি লাশের চেরা বুক থেকে কলিজা খাচ্ছে! ‘সে মরা মানুষের কলজে মাংস খায়!’ শিরোনামে খবরটি ছাপা হওয়ার পরও কর্তৃপক্ষের টনক নড়তে দুদিন লেগে যায়। অবশেষে গ্রেপ্তার করা হয় খলিলুল্লাহ নামের এই মানুষখেকোকে এবং মানসিক চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয় পাবনা মানসিক হাসপাতালে। ২০০৫ সালে মারা যায় সে। বছর দুয়েক আগে স্মৃতিতে আবারও ফিরে আসে খলিলুল্লাহ।

ওই মাংস না খাইলে পাগল অইয়া যাইমু ১৯৭৫ সালের তোলপাড় করা নরমাংস খাওয়ার ঘটনা সারা দেশে লোকমুখে ফিরতে ফিরতে একসময় পর্দার আড়ালে চলে যায়। মানসিক চিকিৎসার জন্য খলিলুল্লাহকে পাবনা পাঠানোর মাধ্যমে ঘটনাটি মিলিয়ে যেতে থাকে। তবে যারাই ঘটনাটি শুনেছে, তাদের মনে তা বিভীষিকার সূচনা করেছে।

১৯৯৭ সালের দিকে অনেকটা কাকতালীয়ভাবে সঙ্গে নরমাংসখেকো খলিলুল্লাহর সাক্ষাৎ মেলে আজিমপুর কবরস্থানের গেটে। লম্বা, বয়সের ভারে কিছুটা কুঁজো, চাপ দাড়িওয়ালা, লুঙ্গি-শার্ট পরা খলিলুল্লাহ নিজেকে সুস্থ দাবি করে। তবে সুস্থ হলে এখনো কেন কবরস্থানের আশপাশে ঘুরে বেড়ায়, এ প্রশ্নের জবাবে সে বলেন তার কোনো আত্নীয়স্বজন বা জ্ঞাতিগোষ্ঠীর সন্ধান জানে না। কেউ তার খোঁজ নিতেও আসেনি। যার কারণে কবরস্থানের এখানে-সেখানে সে ঘুরে বেড়ায়। মানুষ তার পরিচয় পেয়ে দুই-চার টাকা সাহায্য দেয়। তা দিয়ে তার পেট চলে যায়।

রাতে কবরস্থানের বাইরে কোনো জায়গায় ঘুমিয়ে পড়ে। মানুষের মাংস ও কলিজা খাওয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে খলিলুল্লাহ প্রথমে কিছুটা ইতস্তত বোধ করে। পরে তাকে পেটপুরে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা হয়। এতে বেশ কাজ হয়। অনর্গল বলে যায় পুরনো দিনের কথা। তবে কেন সে নরমাংস খেত, তা ঠিকমতো বলতে পারেনি। হঠাৎ মাথায় গণ্ডগোল হলে সে কী করত তা নিজেই অনুভব করতে পারত না। তবে খলিলুল্লাহ প্রতিবেদকের কাছে আরো জানায়, পাবনা মানসিক হাসপাতালের চিকিৎসায় সে ভালো হয়ে যায়; কিন্তু কলিজাখেকো বলে কেউ তাকে কাজ কিংবা আশ্রয় দেয়নি। অনেকে শারীরিকভাবে আঘাতও করেছে। যার জন্য শুধু বেঁচে থাকার অবলম্বন হিসেবে কবরস্থানকে বেছে নিয়েছে। তবে মরা মানুষের মাংসের লোভে নয়, শুধু নিজেকে সমাজ থেকে দূরে রাখার জন্য।

যদি মানুষের মাংস খাওয়ার জন্যই কবরস্থানে আসি, তাহলে তো কবরস্থান কর্তৃপক্ষ অনেক আগেই তাড়িয়ে দিত বলে সে দাবি করে। তবে দৈনিক বাংলা কিংবা বিচিত্রায় তাকে নিয়ে যখন কভার স্টোরি করা হয়, তখন সে ছিল উন্মাদ। প্রতিবেদক আরিফুর রহমান যখন খলিলুল্লাহকে বললেন তাকে বেশি বেশি লাশ খেতে দেওয়া হবে, তখন সে লাফ দিয়ে উঠে বলেছিল, ‘স্যার, আমাকে লাশ খেতে দেবেন?’ হা হা বলে একটা অট্টহাসিও দিয়েছিল।

একজন ইয়ার্কি করে বললেন, তুই যে মানুষের মাংস খাস তা কি বাস্তবে দেখাতে পারবি? সঙ্গে সঙ্গে খলিলুল্লাহ মর্গের ভেতরে ঢুকে ছুরি দিয়ে এক টুকরো মাংস নিয়ে আসে। সঙ্গে কলিজার টুকরো। তার সামনেই পৈশাচিকভাবে কলিজার টুকরো কচকচিয়ে খেতে লাগল। এরপর প্রতিবেদক খলিলুল্লাহকে ডেকে ২০ টাকা দিলেন, যাতে ঘটনাটি অন্য কোনো সাংবাদিককে না বলে। তবে খলিলুল্লাহর শর্ত ছিল একটাই সাংবাদিককে মর্গের ডোম রবিকে বলে দিতে হবে তাকে যেন মরা মানুষের কলিজা বেশি খেতে দেয়। এ প্রতিবেদক ১৯৯৭ সালের শেষের দিকে খলিলুল্লাহকে পেয়ে পুরনো ঘটনার অবতারণা করলে তার চোখ চঞ্চল হয়ে ওঠে। অতৃপ্ত মনের নরমাংস খাওয়ার নেশা যেন চোখেমুখে প্রকাশ পায়। পুরনো অভ্যাসটা এখনো ভুলতে পারেনি। তবে পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নেয়। বলে, স্যার অতীতকে ভুলতে চাই। সভ্য হয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বাঁচতে চাই

খলিলুল্লাহ যেভাবে কলিজাখেকো হলো :

খলিলুল্লাহ যেভাবে কলিজাখেকো হলো :

দৈনিক বাংলায় সংবাদটি ছাপা হওয়ার পর গণমাধ্যমে রীতিমতো তোলপাড় শুরু হয়।
খলিলুল্লাহ নরমাংসের নেশায় মর্গে আসতেই হাসপাতাল কর্মচারীরা তাকে ধরে ফেলেন। তারপর তাকে হাসপাতালের তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক কর্নেল এম এল রহমানের কক্ষে হাজির করা হয়। কর্নেল সাহেব ডেকে পাঠান কলেজের অধ্যক্ষ ডা. এম এ জলিল, মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সামাদসহ আরো কয়েকজন মানসিক বিশেষজ্ঞকে। তাঁরা খলিলুল্লাহকে অভয় দিয়ে ঘটনা খুলে বলতে বললে অনেক চাঞ্চল্যকর কাহিনী বেরিয়ে আসে। তা তার জবানবন্দিতেই জানা যাক।

রবি ডোম আর খলিলুল্লাহ ছোটবেলায় বন্ধু ছিল। তখন সে লালবাগ এলাকায় থাকত। সেখান থেকে প্রতিদিন হেঁটেই মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতলের মর্গে আসত। রবি ডোমের বাবা ছিল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের প্রথম ডোম। সে-ই খলিলুল্লাহ ও রবি ডোমকে প্রথম মরা মানুষের মাংস খেতে দিত। পরে রবি ডোম নরমাংস খাওয়া ছেড়ে দেয়। কিন্তু খলিলুল্লাহ তা ছাড়তে পারেনি। অন্তত ১৫ দিন পর পর তার নরমাংস চাই। শুধু ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ নয়, মিটফোর্ড হাসপাতালের গোপাল ডোম ও সোনা ডোম তাকে মরা মানুষের মাংস খেতে দেয়।

নরমাংস ছাড়াও লাশের কাফনের কাপড় চুরি করা তার নেশা। ঢাকার বিভিন্ন কবরস্থান থেকে কবর খুঁড়ে কাপড় এনে তা মৌলভীবাজারের কাছাকাছি পুরনো কাপড়ের দোকানে বিক্রি করত। কাপড় বিক্রির টাকা দিয়ে স্বাভাবিক খাবার খেত।
খলিলুল্লাহ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে আরো বলেছে, সে তার খালা মমিনাকে মানুষের মাংস খাসির মাংস বলে রান্না করে খাইয়েছে। এসব তথ্য শুনে কর্তৃপক্ষ রীতিমতো হতবাক হয়ে যায়। এরপর তাৎক্ষণিক পরীক্ষার জন্য হাসপাতালের রান্নাঘর থেকে মুরগির কাঁচা মাংস এনে দেওয়া হয় তাকে। সবাইকে অবাক করে দিয়ে সে মুরগির কাঁচা মাংস চার ডাক্তারের সামনেই চিবিয়ে চিবিয়ে খেয়ে ফেলে।
এরপর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেয়, খলিলুল্লাহকে আর জনসমক্ষে রাখা যায় না।

পরে সে জ্যান্ত মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে_এ আশঙ্কায় পুলিশ ডাকা হলো। পুলিশ এসে খলিলুল্লাহকে হ্যান্ডকাফ লাগিয়ে রমনা থানায় নিয়ে যায়। শুরু হয় নতুন করে পুলিশি জেরা। কিন্তু পুলিশকে বোকা বানিয়ে খলিলুল্লাহ দৃঢ়কণ্ঠে ঘোষণা করে_সে মানুষের মাংস খায়, ভবিষ্যতেও খাবে। এ ঘোষণার ভেতর দিয়ে পুলিশ নিশ্চিত হয়, খলিলুল্লাহ কোনো দাগি ক্রিমিনাল নয়, একজন জটিল মানসিক রোগী।

মানসিক বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী তাকে ঢাকার আদালতে পাঠানো হয়। সবকিছু শুনে বিচারক খলিলুল্লাহকে পাবনা মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠানোর নির্দেশ দেন।

স্বঘোষিত ও প্রমাণিত নরমাংসসেবী খলিলুল্লাহর আত্দপরিচয় সম্পর্কে অনেক খোঁজখবর নিয়েও কোনো সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে দৈনিক বাংলার মেডিক্যাল কলেজ প্রতিনিধি আরিফুর রহমানের কাছে সে স্বীকার করেছে, তার গ্রামের বাড়ি নরসিংদী এলাকায়। বাবার নাম আব্দুল মান্নান। গ্রাম থেকে ঢাকায় এসে প্রথমে বিভিন্ন বাসায় চাকরের কাজ করত। কিন্তু বাসায় কাজ করতে গিয়ে মনিবের প্রহারে তার মাথায় গণ্ডগোল দেখা দেয়। এর পরের ঘটনা তার মনে নেই।

খলিলের জীবনে প্রেম-সংসার

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নায়ক এবং লাখ লাখ মানুষ হত্যার অভিযোগের আঙুল উঠেছিল যে হিটলারের দিকে, সেই ব্যক্তিটি কিন্তু ছিলেন একজন খ্যাতিমান অঙ্কন শিল্পী। শিল্পীর সৃষ্টিশীল মনের গভীরেই যে যুদ্ধ, পৈশাচিক ও নিষ্ঠুর মন বসবাস করত সেটা বিশ্ববাসী অবাক হয়ে দেখেছে। তেমনি নরমাংস কিংবা কলিজা খেয়ে যে খলিলুল্লাহ আত্দতৃপ্তি পেত, যার নাম শুনলেই একসময় মানুষ আঁতকে উঠত, সত্তর দশকে যার নাম বলে মানুষে শিশুদের ঘুম পাড়াত, সে ব্যক্তিটি শেষ জীবনে মৃদুভাষী একজন ভাবুকে পরিণত হয়েছিল। সভ্য সমাজের ভদ্রলোকেরা তাকে ঘৃণায় দূরে ঠেলে দিলেও, আজিমপুর কবরস্থানে ভাগ্যবিড়ম্বিত কিছু ভিক্ষুক কাছে টেনে নিয়েছিলেন। বেঁচে থাকার জন্য ভিক্ষুকের সারিতে বসে খলিলুল্লাহ ভাবত বিগত দিনে যে লোমহর্ষক ঘটনা সে ঘটিয়েছিল, সেটা কি আসলে সত্য!

খলিলের দিকে মানুষ এমনভাবে তাকিয়ে থাকে কেন? অন্য কারো দিকে তো অদ্ভুত দৃষ্টিতে এভাবে তাকিয়ে দেখে না। খলিল মনে মনে ভাবে, আমি কি তাহলে ভিন্ন প্রকৃতির কোনো লোক? জবাব মেলে সহযোগী ভিক্ষুক কমলা আক্তারের কাছ থেকে। ‘তুমি তো আগে পাগল ছিলে, মানুষের মাংস এবং কলিজা খেতে। তোমার নাম শুনলে অনেকে ভয় পায়। তবে তুমি এখন ভালো হয়ে গেছ।’ কোনো কথা বলত না খলিল। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকত কমলার দিকে। সবাই দূরে চলে যায়, কথা বলতে চায় না, শুধু কমলাই তার খোঁজ-খবর নেয়; খাওয়া-দাওয়া হয়েছে কি না।

অসুস্থ হলে কয়েকবার দোকান থেকে ওষুধ কিনে খাইয়েছেন কমলা আক্তার।
এসব ভাবতে ভাবতেই তার মনে প্রেমভাব জাগ্রত হয়ে ওঠে। ভিক্ষুক সারিতে বসে মনের ভাব আদান-প্রদান আর সুখ-দুঃখের কথা ভাগাভাগি করতে গিয়েই পাশের ভিখারিণীকে তার ভালো লেগে যায়। জীবনের শেষ অবলম্বন হিসেবে আঁকড়ে ধরে তাকে। ব্যাপারটা তার সহকর্মীরাও বুঝে যান। তাই দুজনকে এক করে সংসার করার জন্য বি‌য়ে দি‌য়ে দেন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

CrimeNews Media24

মানুষের কলিজা ‘খেকো’ খলিলুল্লাহর ভয়ঙ্কর ইতিহাস !

আপডেট সময় ০৫:২৬:২৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬

মানুষের কলিজা ‘খেকো’ খলিলুল্লাহর ভয়ঙ্কর ইতিহাস !

১৯৭৫ সালের ৩ এপ্রিল। দৈনিক বাংলার একটি বক্স নিউজ পড়ে শিউরে ওঠে গোটা বাংলাদেশ। ছবিতে দেখা যায় এক যুবক মরা একটি লাশের চেরা বুক থেকে কলিজা খাচ্ছে! ‘সে মরা মানুষের কলজে মাংস খায়!’ শিরোনামে খবরটি ছাপা হওয়ার পরও কর্তৃপক্ষের টনক নড়তে দুদিন লেগে যায়। অবশেষে গ্রেপ্তার করা হয় খলিলুল্লাহ নামের এই মানুষখেকোকে এবং মানসিক চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয় পাবনা মানসিক হাসপাতালে। ২০০৫ সালে মারা যায় সে। বছর দুয়েক আগে স্মৃতিতে আবারও ফিরে আসে খলিলুল্লাহ।

ওই মাংস না খাইলে পাগল অইয়া যাইমু ১৯৭৫ সালের তোলপাড় করা নরমাংস খাওয়ার ঘটনা সারা দেশে লোকমুখে ফিরতে ফিরতে একসময় পর্দার আড়ালে চলে যায়। মানসিক চিকিৎসার জন্য খলিলুল্লাহকে পাবনা পাঠানোর মাধ্যমে ঘটনাটি মিলিয়ে যেতে থাকে। তবে যারাই ঘটনাটি শুনেছে, তাদের মনে তা বিভীষিকার সূচনা করেছে।

১৯৯৭ সালের দিকে অনেকটা কাকতালীয়ভাবে সঙ্গে নরমাংসখেকো খলিলুল্লাহর সাক্ষাৎ মেলে আজিমপুর কবরস্থানের গেটে। লম্বা, বয়সের ভারে কিছুটা কুঁজো, চাপ দাড়িওয়ালা, লুঙ্গি-শার্ট পরা খলিলুল্লাহ নিজেকে সুস্থ দাবি করে। তবে সুস্থ হলে এখনো কেন কবরস্থানের আশপাশে ঘুরে বেড়ায়, এ প্রশ্নের জবাবে সে বলেন তার কোনো আত্নীয়স্বজন বা জ্ঞাতিগোষ্ঠীর সন্ধান জানে না। কেউ তার খোঁজ নিতেও আসেনি। যার কারণে কবরস্থানের এখানে-সেখানে সে ঘুরে বেড়ায়। মানুষ তার পরিচয় পেয়ে দুই-চার টাকা সাহায্য দেয়। তা দিয়ে তার পেট চলে যায়।

রাতে কবরস্থানের বাইরে কোনো জায়গায় ঘুমিয়ে পড়ে। মানুষের মাংস ও কলিজা খাওয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে খলিলুল্লাহ প্রথমে কিছুটা ইতস্তত বোধ করে। পরে তাকে পেটপুরে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা হয়। এতে বেশ কাজ হয়। অনর্গল বলে যায় পুরনো দিনের কথা। তবে কেন সে নরমাংস খেত, তা ঠিকমতো বলতে পারেনি। হঠাৎ মাথায় গণ্ডগোল হলে সে কী করত তা নিজেই অনুভব করতে পারত না। তবে খলিলুল্লাহ প্রতিবেদকের কাছে আরো জানায়, পাবনা মানসিক হাসপাতালের চিকিৎসায় সে ভালো হয়ে যায়; কিন্তু কলিজাখেকো বলে কেউ তাকে কাজ কিংবা আশ্রয় দেয়নি। অনেকে শারীরিকভাবে আঘাতও করেছে। যার জন্য শুধু বেঁচে থাকার অবলম্বন হিসেবে কবরস্থানকে বেছে নিয়েছে। তবে মরা মানুষের মাংসের লোভে নয়, শুধু নিজেকে সমাজ থেকে দূরে রাখার জন্য।

যদি মানুষের মাংস খাওয়ার জন্যই কবরস্থানে আসি, তাহলে তো কবরস্থান কর্তৃপক্ষ অনেক আগেই তাড়িয়ে দিত বলে সে দাবি করে। তবে দৈনিক বাংলা কিংবা বিচিত্রায় তাকে নিয়ে যখন কভার স্টোরি করা হয়, তখন সে ছিল উন্মাদ। প্রতিবেদক আরিফুর রহমান যখন খলিলুল্লাহকে বললেন তাকে বেশি বেশি লাশ খেতে দেওয়া হবে, তখন সে লাফ দিয়ে উঠে বলেছিল, ‘স্যার, আমাকে লাশ খেতে দেবেন?’ হা হা বলে একটা অট্টহাসিও দিয়েছিল।

একজন ইয়ার্কি করে বললেন, তুই যে মানুষের মাংস খাস তা কি বাস্তবে দেখাতে পারবি? সঙ্গে সঙ্গে খলিলুল্লাহ মর্গের ভেতরে ঢুকে ছুরি দিয়ে এক টুকরো মাংস নিয়ে আসে। সঙ্গে কলিজার টুকরো। তার সামনেই পৈশাচিকভাবে কলিজার টুকরো কচকচিয়ে খেতে লাগল। এরপর প্রতিবেদক খলিলুল্লাহকে ডেকে ২০ টাকা দিলেন, যাতে ঘটনাটি অন্য কোনো সাংবাদিককে না বলে। তবে খলিলুল্লাহর শর্ত ছিল একটাই সাংবাদিককে মর্গের ডোম রবিকে বলে দিতে হবে তাকে যেন মরা মানুষের কলিজা বেশি খেতে দেয়। এ প্রতিবেদক ১৯৯৭ সালের শেষের দিকে খলিলুল্লাহকে পেয়ে পুরনো ঘটনার অবতারণা করলে তার চোখ চঞ্চল হয়ে ওঠে। অতৃপ্ত মনের নরমাংস খাওয়ার নেশা যেন চোখেমুখে প্রকাশ পায়। পুরনো অভ্যাসটা এখনো ভুলতে পারেনি। তবে পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নেয়। বলে, স্যার অতীতকে ভুলতে চাই। সভ্য হয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বাঁচতে চাই

খলিলুল্লাহ যেভাবে কলিজাখেকো হলো :

খলিলুল্লাহ যেভাবে কলিজাখেকো হলো :

দৈনিক বাংলায় সংবাদটি ছাপা হওয়ার পর গণমাধ্যমে রীতিমতো তোলপাড় শুরু হয়।
খলিলুল্লাহ নরমাংসের নেশায় মর্গে আসতেই হাসপাতাল কর্মচারীরা তাকে ধরে ফেলেন। তারপর তাকে হাসপাতালের তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক কর্নেল এম এল রহমানের কক্ষে হাজির করা হয়। কর্নেল সাহেব ডেকে পাঠান কলেজের অধ্যক্ষ ডা. এম এ জলিল, মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সামাদসহ আরো কয়েকজন মানসিক বিশেষজ্ঞকে। তাঁরা খলিলুল্লাহকে অভয় দিয়ে ঘটনা খুলে বলতে বললে অনেক চাঞ্চল্যকর কাহিনী বেরিয়ে আসে। তা তার জবানবন্দিতেই জানা যাক।

রবি ডোম আর খলিলুল্লাহ ছোটবেলায় বন্ধু ছিল। তখন সে লালবাগ এলাকায় থাকত। সেখান থেকে প্রতিদিন হেঁটেই মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতলের মর্গে আসত। রবি ডোমের বাবা ছিল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের প্রথম ডোম। সে-ই খলিলুল্লাহ ও রবি ডোমকে প্রথম মরা মানুষের মাংস খেতে দিত। পরে রবি ডোম নরমাংস খাওয়া ছেড়ে দেয়। কিন্তু খলিলুল্লাহ তা ছাড়তে পারেনি। অন্তত ১৫ দিন পর পর তার নরমাংস চাই। শুধু ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ নয়, মিটফোর্ড হাসপাতালের গোপাল ডোম ও সোনা ডোম তাকে মরা মানুষের মাংস খেতে দেয়।

নরমাংস ছাড়াও লাশের কাফনের কাপড় চুরি করা তার নেশা। ঢাকার বিভিন্ন কবরস্থান থেকে কবর খুঁড়ে কাপড় এনে তা মৌলভীবাজারের কাছাকাছি পুরনো কাপড়ের দোকানে বিক্রি করত। কাপড় বিক্রির টাকা দিয়ে স্বাভাবিক খাবার খেত।
খলিলুল্লাহ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে আরো বলেছে, সে তার খালা মমিনাকে মানুষের মাংস খাসির মাংস বলে রান্না করে খাইয়েছে। এসব তথ্য শুনে কর্তৃপক্ষ রীতিমতো হতবাক হয়ে যায়। এরপর তাৎক্ষণিক পরীক্ষার জন্য হাসপাতালের রান্নাঘর থেকে মুরগির কাঁচা মাংস এনে দেওয়া হয় তাকে। সবাইকে অবাক করে দিয়ে সে মুরগির কাঁচা মাংস চার ডাক্তারের সামনেই চিবিয়ে চিবিয়ে খেয়ে ফেলে।
এরপর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেয়, খলিলুল্লাহকে আর জনসমক্ষে রাখা যায় না।

পরে সে জ্যান্ত মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে_এ আশঙ্কায় পুলিশ ডাকা হলো। পুলিশ এসে খলিলুল্লাহকে হ্যান্ডকাফ লাগিয়ে রমনা থানায় নিয়ে যায়। শুরু হয় নতুন করে পুলিশি জেরা। কিন্তু পুলিশকে বোকা বানিয়ে খলিলুল্লাহ দৃঢ়কণ্ঠে ঘোষণা করে_সে মানুষের মাংস খায়, ভবিষ্যতেও খাবে। এ ঘোষণার ভেতর দিয়ে পুলিশ নিশ্চিত হয়, খলিলুল্লাহ কোনো দাগি ক্রিমিনাল নয়, একজন জটিল মানসিক রোগী।

মানসিক বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী তাকে ঢাকার আদালতে পাঠানো হয়। সবকিছু শুনে বিচারক খলিলুল্লাহকে পাবনা মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠানোর নির্দেশ দেন।

স্বঘোষিত ও প্রমাণিত নরমাংসসেবী খলিলুল্লাহর আত্দপরিচয় সম্পর্কে অনেক খোঁজখবর নিয়েও কোনো সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে দৈনিক বাংলার মেডিক্যাল কলেজ প্রতিনিধি আরিফুর রহমানের কাছে সে স্বীকার করেছে, তার গ্রামের বাড়ি নরসিংদী এলাকায়। বাবার নাম আব্দুল মান্নান। গ্রাম থেকে ঢাকায় এসে প্রথমে বিভিন্ন বাসায় চাকরের কাজ করত। কিন্তু বাসায় কাজ করতে গিয়ে মনিবের প্রহারে তার মাথায় গণ্ডগোল দেখা দেয়। এর পরের ঘটনা তার মনে নেই।

খলিলের জীবনে প্রেম-সংসার

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নায়ক এবং লাখ লাখ মানুষ হত্যার অভিযোগের আঙুল উঠেছিল যে হিটলারের দিকে, সেই ব্যক্তিটি কিন্তু ছিলেন একজন খ্যাতিমান অঙ্কন শিল্পী। শিল্পীর সৃষ্টিশীল মনের গভীরেই যে যুদ্ধ, পৈশাচিক ও নিষ্ঠুর মন বসবাস করত সেটা বিশ্ববাসী অবাক হয়ে দেখেছে। তেমনি নরমাংস কিংবা কলিজা খেয়ে যে খলিলুল্লাহ আত্দতৃপ্তি পেত, যার নাম শুনলেই একসময় মানুষ আঁতকে উঠত, সত্তর দশকে যার নাম বলে মানুষে শিশুদের ঘুম পাড়াত, সে ব্যক্তিটি শেষ জীবনে মৃদুভাষী একজন ভাবুকে পরিণত হয়েছিল। সভ্য সমাজের ভদ্রলোকেরা তাকে ঘৃণায় দূরে ঠেলে দিলেও, আজিমপুর কবরস্থানে ভাগ্যবিড়ম্বিত কিছু ভিক্ষুক কাছে টেনে নিয়েছিলেন। বেঁচে থাকার জন্য ভিক্ষুকের সারিতে বসে খলিলুল্লাহ ভাবত বিগত দিনে যে লোমহর্ষক ঘটনা সে ঘটিয়েছিল, সেটা কি আসলে সত্য!

খলিলের দিকে মানুষ এমনভাবে তাকিয়ে থাকে কেন? অন্য কারো দিকে তো অদ্ভুত দৃষ্টিতে এভাবে তাকিয়ে দেখে না। খলিল মনে মনে ভাবে, আমি কি তাহলে ভিন্ন প্রকৃতির কোনো লোক? জবাব মেলে সহযোগী ভিক্ষুক কমলা আক্তারের কাছ থেকে। ‘তুমি তো আগে পাগল ছিলে, মানুষের মাংস এবং কলিজা খেতে। তোমার নাম শুনলে অনেকে ভয় পায়। তবে তুমি এখন ভালো হয়ে গেছ।’ কোনো কথা বলত না খলিল। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকত কমলার দিকে। সবাই দূরে চলে যায়, কথা বলতে চায় না, শুধু কমলাই তার খোঁজ-খবর নেয়; খাওয়া-দাওয়া হয়েছে কি না।

অসুস্থ হলে কয়েকবার দোকান থেকে ওষুধ কিনে খাইয়েছেন কমলা আক্তার।
এসব ভাবতে ভাবতেই তার মনে প্রেমভাব জাগ্রত হয়ে ওঠে। ভিক্ষুক সারিতে বসে মনের ভাব আদান-প্রদান আর সুখ-দুঃখের কথা ভাগাভাগি করতে গিয়েই পাশের ভিখারিণীকে তার ভালো লেগে যায়। জীবনের শেষ অবলম্বন হিসেবে আঁকড়ে ধরে তাকে। ব্যাপারটা তার সহকর্মীরাও বুঝে যান। তাই দুজনকে এক করে সংসার করার জন্য বি‌য়ে দি‌য়ে দেন।