ঢাকা ০১:৫০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আধুনিক আরাম বনাম ৩৫০ বছরের ইতিহাস

  • Reporter Name
  • আপডেট সময় ০১:৪৬:১৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

আধুনিক আরাম বনাম ৩৫০ বছরের ইতিহাস:
মুঘল স্থাপত্যে এসি (AC) ব্যবহারের অলক্ষিত গাঠনিক ঝুঁকি

পুরান ঢাকাসহ পুরো ঢাকা শহরের বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা আমাদের গর্ব—মুঘল আমলের প্রাচীন মসজিদগুলোর স্থায়িত্ব এবং একটি মারাত্মক গাঠনিক সংকট।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঢাকার বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও প্রাচীন মুঘল মসজিদে নামাজিদের তাৎক্ষণিক আরামের কথা চিন্তা করে দেদারসে এয়ার কন্ডিশনার (AC) বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র স্থাপনের একটি তীব্র প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি ভালো উদ্যোগ মনে হলেও, প্রত্নতাত্ত্বিক বিজ্ঞান এবং গাঠনিক প্রকৌশল (Structural Engineering) বলছে—এই আধুনিক রূপান্তর আমাদের ৩৫০ বছরের পুরনো ঐতিহাসিক স্মারকগুলোকে চিরতরে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে!

প্রাচীন চুন-সুরকির দেয়াল কেন আধুনিক কংক্রিট নয়?আমাদের বুঝতে হবে, মুঘল আমলের (১৭শ-১৮শ শতক) স্থাপনাগুলোতে আজকের দিনের মতো পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট বা রড ব্যবহার করা হতো না। এগুলো তৈরি হতো চুন, সুরকি, ইট, বেলের আঠা এবং চিটাগুড়ের বিশেষ মিশ্রণে। এই প্রাচীন উপাদানগুলোর একটি প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য হলো, এরা প্রাকৃতিকভাবে “নিঃশ্বাস” নেয়। অর্থাৎ, এরা বাতাসের আর্দ্রতা (Moisture) নিজে থেকেই শোষণ ও মুক্ত করে ভেতরের তাপমাত্রা সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখে।

যখন এই সংবেদনশীল প্রাচীন স্থাপনাগুলোতে কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞের মতামত ছাড়াই এসি বসানো হয়, তখন প্রধানত ৩টি মারাত্মক কারিগরি ক্ষতি সাধন হয়:

১. অনবরত মাইক্রো-ভাইব্রেশন ও অভ্যন্তরীণ ফাটল (Continuous Micro-Vibrations):
এসির আউটডোর বা কম্প্রেশার ইউনিটগুলো যখন অনবরত চলে, তখন এর মধ্যে একটি নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সির কাঁপন বা ভাইব্রেশন তৈরি হয়। শত শত বছরের পুরনো চুন-সুরকির দেয়াল বা ছাদ এই অনবরত মেকানিক্যাল ভাইব্রেশন সহ্য করার মতো অবস্থায় থাকে না। এর ফলে ধীরে ধীরে ইটের অভ্যন্তরীণ বাঁধন আলগা হয়ে যায় এবং দেয়ালে মারাত্মক অদৃশ্য ফাটল (Structural Cracks) দেখা দেয়।

২. লবণাক্ততা ও আস্তর খসে পড়া (Condensation & Dampness):
এসি চললে ভেতরের বাতাস প্রচণ্ড ঠান্ডা হয়, কিন্তু বাইরের দেয়াল সূর্যের তাপে গরম থাকে। এই চরম তাপমাত্রার পার্থক্যের কারণে দেয়ালের ভেতরে প্রাকৃতিকভাবে জলীয় বাষ্প বা পানির কণা জমতে শুরু করে (Condensation)। প্রাচীন চুন-সুরকি এই পানি শুষে নেওয়ার ফলে দেয়ালে স্থায়ী ড্যাম্পনেস বা সেঁতসেঁতে ভাবের সৃষ্টি হয়। এর ফলে দেয়ালে নোনা ধরে (Efflorescence) এবং মুঘল আমলের মহামূল্যবান চুন-সুরকির প্লাস্টার ও কারুকার্য খসে পড়তে শুরু করে।

৩. ড্রিল ও প্রাচীর পাংচার (Structural Puncture):
Stand-up বা স্প্লিট এসির পাইপলাইন ও ক্যাবল বাইরে নেওয়ার জন্য যখন ৩৫০ বছরের পুরনো মূল দেয়াল বা ছাদকে ড্রিল করে ছিদ্র করা হয়, তখন সেই নির্দিষ্ট অংশের গাঠনিক শক্তি চিরতরে নষ্ট হয়ে যায়। বর্ষাকালে ওই ছিদ্রে পানি ঢুকে প্রাচীন দেয়ালের ভেতরের অংশকে ধসিয়ে দিতে পারে।

পুরাকীর্তি সংরক্ষণ ও আমাদের দায়িত্ব:
পৃথিবীর যেকোনো দেশে ১০০ বছরের বেশি পুরনো যেকোনো প্রাচীন স্মারকের মূল কাঠামোতে হাত দেওয়া আইনি ও নৈতিকভাবে নিষিদ্ধ। অতীতে না বুঝেই ঢাকার বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক মসজিদে এই ভুল সংস্কার করা হয়েছে, যার খেসারত আজ আমাদেরই দিতে হচ্ছে বা হবে।

প্রযুক্তির যুগে নামাজিদের আরাম নিশ্চিত করার বিকল্প উপায় রয়েছে (যেমন উন্নত এয়ার কুলিং সিস্টেম বা বায়ু চলাচলের প্রাকৃতিক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন), কিন্তু একটি মুঘল স্থাপত্য একবার ধ্বংস হয়ে গেলে তা আর কখনোই ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। আমাদের ঐতিহ্যের ঝরোকা যেন চিরতরে বন্ধ না হয়ে যায়, সেজন্য প্রাচীন পুরাকীর্তি সংরক্ষণে আমাদের আরও বিজ্ঞানমনস্ক হতে হবে।

 

সংগৃহীত

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

CrimeNews Media24

আধুনিক আরাম বনাম ৩৫০ বছরের ইতিহাস

আপডেট সময় ০১:৪৬:১৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আধুনিক আরাম বনাম ৩৫০ বছরের ইতিহাস:
মুঘল স্থাপত্যে এসি (AC) ব্যবহারের অলক্ষিত গাঠনিক ঝুঁকি

পুরান ঢাকাসহ পুরো ঢাকা শহরের বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা আমাদের গর্ব—মুঘল আমলের প্রাচীন মসজিদগুলোর স্থায়িত্ব এবং একটি মারাত্মক গাঠনিক সংকট।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঢাকার বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও প্রাচীন মুঘল মসজিদে নামাজিদের তাৎক্ষণিক আরামের কথা চিন্তা করে দেদারসে এয়ার কন্ডিশনার (AC) বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র স্থাপনের একটি তীব্র প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি ভালো উদ্যোগ মনে হলেও, প্রত্নতাত্ত্বিক বিজ্ঞান এবং গাঠনিক প্রকৌশল (Structural Engineering) বলছে—এই আধুনিক রূপান্তর আমাদের ৩৫০ বছরের পুরনো ঐতিহাসিক স্মারকগুলোকে চিরতরে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে!

প্রাচীন চুন-সুরকির দেয়াল কেন আধুনিক কংক্রিট নয়?আমাদের বুঝতে হবে, মুঘল আমলের (১৭শ-১৮শ শতক) স্থাপনাগুলোতে আজকের দিনের মতো পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট বা রড ব্যবহার করা হতো না। এগুলো তৈরি হতো চুন, সুরকি, ইট, বেলের আঠা এবং চিটাগুড়ের বিশেষ মিশ্রণে। এই প্রাচীন উপাদানগুলোর একটি প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য হলো, এরা প্রাকৃতিকভাবে “নিঃশ্বাস” নেয়। অর্থাৎ, এরা বাতাসের আর্দ্রতা (Moisture) নিজে থেকেই শোষণ ও মুক্ত করে ভেতরের তাপমাত্রা সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখে।

যখন এই সংবেদনশীল প্রাচীন স্থাপনাগুলোতে কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞের মতামত ছাড়াই এসি বসানো হয়, তখন প্রধানত ৩টি মারাত্মক কারিগরি ক্ষতি সাধন হয়:

১. অনবরত মাইক্রো-ভাইব্রেশন ও অভ্যন্তরীণ ফাটল (Continuous Micro-Vibrations):
এসির আউটডোর বা কম্প্রেশার ইউনিটগুলো যখন অনবরত চলে, তখন এর মধ্যে একটি নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সির কাঁপন বা ভাইব্রেশন তৈরি হয়। শত শত বছরের পুরনো চুন-সুরকির দেয়াল বা ছাদ এই অনবরত মেকানিক্যাল ভাইব্রেশন সহ্য করার মতো অবস্থায় থাকে না। এর ফলে ধীরে ধীরে ইটের অভ্যন্তরীণ বাঁধন আলগা হয়ে যায় এবং দেয়ালে মারাত্মক অদৃশ্য ফাটল (Structural Cracks) দেখা দেয়।

২. লবণাক্ততা ও আস্তর খসে পড়া (Condensation & Dampness):
এসি চললে ভেতরের বাতাস প্রচণ্ড ঠান্ডা হয়, কিন্তু বাইরের দেয়াল সূর্যের তাপে গরম থাকে। এই চরম তাপমাত্রার পার্থক্যের কারণে দেয়ালের ভেতরে প্রাকৃতিকভাবে জলীয় বাষ্প বা পানির কণা জমতে শুরু করে (Condensation)। প্রাচীন চুন-সুরকি এই পানি শুষে নেওয়ার ফলে দেয়ালে স্থায়ী ড্যাম্পনেস বা সেঁতসেঁতে ভাবের সৃষ্টি হয়। এর ফলে দেয়ালে নোনা ধরে (Efflorescence) এবং মুঘল আমলের মহামূল্যবান চুন-সুরকির প্লাস্টার ও কারুকার্য খসে পড়তে শুরু করে।

৩. ড্রিল ও প্রাচীর পাংচার (Structural Puncture):
Stand-up বা স্প্লিট এসির পাইপলাইন ও ক্যাবল বাইরে নেওয়ার জন্য যখন ৩৫০ বছরের পুরনো মূল দেয়াল বা ছাদকে ড্রিল করে ছিদ্র করা হয়, তখন সেই নির্দিষ্ট অংশের গাঠনিক শক্তি চিরতরে নষ্ট হয়ে যায়। বর্ষাকালে ওই ছিদ্রে পানি ঢুকে প্রাচীন দেয়ালের ভেতরের অংশকে ধসিয়ে দিতে পারে।

পুরাকীর্তি সংরক্ষণ ও আমাদের দায়িত্ব:
পৃথিবীর যেকোনো দেশে ১০০ বছরের বেশি পুরনো যেকোনো প্রাচীন স্মারকের মূল কাঠামোতে হাত দেওয়া আইনি ও নৈতিকভাবে নিষিদ্ধ। অতীতে না বুঝেই ঢাকার বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক মসজিদে এই ভুল সংস্কার করা হয়েছে, যার খেসারত আজ আমাদেরই দিতে হচ্ছে বা হবে।

প্রযুক্তির যুগে নামাজিদের আরাম নিশ্চিত করার বিকল্প উপায় রয়েছে (যেমন উন্নত এয়ার কুলিং সিস্টেম বা বায়ু চলাচলের প্রাকৃতিক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন), কিন্তু একটি মুঘল স্থাপত্য একবার ধ্বংস হয়ে গেলে তা আর কখনোই ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। আমাদের ঐতিহ্যের ঝরোকা যেন চিরতরে বন্ধ না হয়ে যায়, সেজন্য প্রাচীন পুরাকীর্তি সংরক্ষণে আমাদের আরও বিজ্ঞানমনস্ক হতে হবে।

 

সংগৃহীত