ঢাকা ০৫:৫৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৭ই নভেম্বর রক্তাক্ত পটপরিবর্তন থেকে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের এক অধ্যায়

  • নুরুন্নবী সোহেল
  • আপডেট সময় ০২:৫২:০৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
  • ৫ বার পড়া হয়েছে

৭ই নভেম্বর রক্তাক্ত পটপরিবর্তন থেকে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের এক অধ্যায়

নুরুন্নবী সোহেল

বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর একটি তাৎপর্যপূর্ণ ও ঘটনাবহুল দিন। এই দিনকে বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হয় ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের রক্তাক্ত রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের দিকে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন। এরপর রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে খন্দকার মোশতাক আহমদের সরকার। রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতার ধারাবাহিকতায় ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে আরেকটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়। একই সময়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিহত হন জাতীয় চার নেতা।

অবশেষে ৭ নভেম্বর ভোরে সেনানিবাসে শুরু হয় সিপাহি বিদ্রোহ। সৈনিকদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে ঘটনাটি ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব’ হিসেবে পরিচিতি পায়। এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন জিয়াউর রহমান। এতে কর্নেল আবু তাহের ও জাসদ-সংশ্লিষ্ট বিপ্লবী সৈনিকদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। পরবর্তী সময়ে এই শক্তিগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ তৈরি হয় এবং আবু তাহেরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

শহীদ জিয়াউর রহমানের অবদান

জিয়াউর রহমানের পরিচয় শুধু ৭ নভেম্বরের ঘটনাকে ঘিরে নয়। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন এবং সেক্টর কমান্ডার ও জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ‘বীর উত্তম’ খেতাব লাভ করেন।

৭ নভেম্বরের পর তাঁর রাজনৈতিক উত্থান ঘটে। ১৯৭৭ সালে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর শাসনামলে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণা প্রতিষ্ঠা, বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনরায় চালু, ১৯ দফা কর্মসূচি, কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন এবং বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৭৮ সালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন।

তবে তাঁর শাসনামল সামরিক আইন, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং বিভিন্ন সামরিক বিদ্রোহের বিচার ও মৃত্যুদণ্ডের কারণে সমালোচিতও হয়েছে। ইতিহাসের নিরপেক্ষ মূল্যায়নে এসব অধ্যায়ও গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।

ইতিহাসের উত্তরাধিকার

৭ নভেম্বর নিয়ে রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা ভিন্ন হতে পারে। কারও কাছে এটি সিপাহি-জনতার বিপ্লব, কারও কাছে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস, আবার কারও কাছে ধারাবাহিক সামরিক অভ্যুত্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

তবে অস্বীকার করার উপায় নেই, ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছিল। মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের অবদান, রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর উদ্যোগ এবং বিএনপি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর একটি স্থায়ী অধ্যায় তৈরি হয়েছে।

ইতিহাস কোনো ব্যক্তি বা দলের একক সম্পত্তি নয়। ইতিহাসের প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা হলো অবদানকে স্বীকার করা, বিতর্ককে বিবেচনায় নেওয়া এবং সত্যকে আড়াল না করা।

৭ নভেম্বর তাই শুধু একটি তারিখ নয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গভীর বাঁকবদলের নাম।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

CrimeNews Media24

৭ই নভেম্বর রক্তাক্ত পটপরিবর্তন থেকে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের এক অধ্যায়

আপডেট সময় ০২:৫২:০৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬

৭ই নভেম্বর রক্তাক্ত পটপরিবর্তন থেকে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের এক অধ্যায়

নুরুন্নবী সোহেল

বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর একটি তাৎপর্যপূর্ণ ও ঘটনাবহুল দিন। এই দিনকে বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হয় ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের রক্তাক্ত রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের দিকে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন। এরপর রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে খন্দকার মোশতাক আহমদের সরকার। রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতার ধারাবাহিকতায় ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে আরেকটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়। একই সময়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিহত হন জাতীয় চার নেতা।

অবশেষে ৭ নভেম্বর ভোরে সেনানিবাসে শুরু হয় সিপাহি বিদ্রোহ। সৈনিকদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে ঘটনাটি ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব’ হিসেবে পরিচিতি পায়। এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন জিয়াউর রহমান। এতে কর্নেল আবু তাহের ও জাসদ-সংশ্লিষ্ট বিপ্লবী সৈনিকদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। পরবর্তী সময়ে এই শক্তিগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ তৈরি হয় এবং আবু তাহেরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

শহীদ জিয়াউর রহমানের অবদান

জিয়াউর রহমানের পরিচয় শুধু ৭ নভেম্বরের ঘটনাকে ঘিরে নয়। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন এবং সেক্টর কমান্ডার ও জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ‘বীর উত্তম’ খেতাব লাভ করেন।

৭ নভেম্বরের পর তাঁর রাজনৈতিক উত্থান ঘটে। ১৯৭৭ সালে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর শাসনামলে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণা প্রতিষ্ঠা, বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনরায় চালু, ১৯ দফা কর্মসূচি, কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন এবং বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৭৮ সালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন।

তবে তাঁর শাসনামল সামরিক আইন, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং বিভিন্ন সামরিক বিদ্রোহের বিচার ও মৃত্যুদণ্ডের কারণে সমালোচিতও হয়েছে। ইতিহাসের নিরপেক্ষ মূল্যায়নে এসব অধ্যায়ও গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।

ইতিহাসের উত্তরাধিকার

৭ নভেম্বর নিয়ে রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা ভিন্ন হতে পারে। কারও কাছে এটি সিপাহি-জনতার বিপ্লব, কারও কাছে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস, আবার কারও কাছে ধারাবাহিক সামরিক অভ্যুত্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

তবে অস্বীকার করার উপায় নেই, ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছিল। মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের অবদান, রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর উদ্যোগ এবং বিএনপি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর একটি স্থায়ী অধ্যায় তৈরি হয়েছে।

ইতিহাস কোনো ব্যক্তি বা দলের একক সম্পত্তি নয়। ইতিহাসের প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা হলো অবদানকে স্বীকার করা, বিতর্ককে বিবেচনায় নেওয়া এবং সত্যকে আড়াল না করা।

৭ নভেম্বর তাই শুধু একটি তারিখ নয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গভীর বাঁকবদলের নাম।