আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কুমিল্লার তিতাস উপজেলার নয়টি ইউনিয়নেই জমে উঠেছে নির্বাচনী মাঠ। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন থেকে ইউপি নির্বাচনের তারিখ চূড়ান্ত ঘোষণার পর থেকেই তিতাসের পাড়া-মহল্লা, হাট-বাজার আর চায়ের দোকানে নির্বাচনী উত্তাপ আরও তীব্র রূপ নিয়েছে।
উল্লেখ্য, এবারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের নিজস্ব দলীয় প্রতীক অর্থাৎ ধানের শীষ বা দাঁড়িপাল্লার মতো প্রতীক থাকছে না। প্রার্থীরা নির্বাচন কমিশন বরাদ্দকৃত সাধারণ স্বতন্ত্র প্রতীকেই লড়াই করবেন। তবে দলীয় প্রতীক না থাকলেও বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো ভেতরে ভেতরে নিজস্ব বোর্ড গঠন করে একক প্রার্থী বাছাই বা দলীয় সমর্থন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় প্রার্থীরা সমর্থনের চিঠি ও সবুজ সংকেত পেতে মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছেন। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সারাদেশে মোট পাঁচটি ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম ধাপের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে ২০ ২৭ সালের ২১শে জানুয়ারি, দ্বিতীয় ধাপে ৪ঠা ফেব্রুয়ারি, তৃতীয় ধাপে ২৯শে এপ্রিল, চতুর্থ ধাপে ১৩ই মে এবং পঞ্চম ও শেষ ধাপের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে ২০ ২৭ সালের ২৭শে মে।
মাঠ পর্যায়ের তথ্য এবং স্থানীয় অনুসন্ধানের ভিত্তিতে তিতাসের নয়টি ইউনিয়নের প্রধান প্রধান চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীদের প্রস্তুতকৃত তালিকা নিচে তুলে ধরা হলো।
১নং সাতানি ইউনিয়নে বিএনপির সমর্থন প্রত্যাশী হিসেবে কাজ করছেন উপজেলা বিএনপির ত্রাণ ও পুনর্বাসন সম্পাদক কামরুজ্জামান হীরা, সহ-স্বেচ্ছাসেবক সম্পাদক মোঃ আলমগীর, হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মোঃ দেলোয়ার হোসেন মোল্লা, সিনিয়র সহ-সভাপতি মোঃ জাকির হোসেন সওদাগর, সাধারণ সম্পাদক মোঃ ডি এম রাসেল, উপজেলা শ্রমিক দলের সদস্য সচিব মোঃ মফিজুল ইসলাম বশির এবং ইউনিয়ন বিএনপির দপ্তর সম্পাদক মোঃ আনোয়ার হোসেন।
২নং জগতপুর ইউনিয়নে বিএনপির সমর্থনে মাঠে রয়েছেন উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাজী মোঃ মুকবুল হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক মুন্সি আমিরুল ইসলাম মানিক, প্রচার সম্পাদক মোঃ সামির হোসেন মোল্লা এবং ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মোঃ আক্তারুল হক মাস্টার।
৩নং বলরামপুর ইউনিয়নে শক্ত দৌড়ে আছেন উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মোঃ কাজী কবীর হোসেন সেন্টু, আক্তারুজ্জামান এবং ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মোঃ মোজাম্মেল হক পাঠান।
৪নং কড়িকান্দি ইউনিয়নে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মাঠের মূল হেভিওয়েট দৌড়ে জোরালো অবস্থান বজায় রেখেছেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান সেলিম ভূইয়া। তার পাশাপাশি শক্ত দৌড়ঝাঁপ করছেন উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি হাজী আলী হোসেন মোল্লা এবং ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মোঃ মোহর মুন্সী। এই ইউনিয়নে জামায়াতের সমর্থন পাচ্ছেন ডাক্তার মোঃ শাহাবুদ্দিন।
৫নং কলাকান্দি ইউনিয়নে লড়ছেন উপজেলা বিএনপির প্রবাসী কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক মোঃ মাহফুজ সরকার, ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি মোঃ দেলোয়ার হোসেন ভূঁইয়া, কলাকান্দি ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি গাজী মোঃ হানিফ এবং কলাকান্দি ইউনিয়ন যুবদলের সি. যুগ্ম আহ্বায়ক এম আই টিপু।
৬নং ভিটিকান্দি ইউনিয়নে প্রচারণায় বিএনপির হেভিওয়েট ও উদীয়মান তরুণ মুখ হিসেবে আলোচনায় আছেন সাংগঠনিক সম্পাদক যুবরাজ ইসলাম রাসেল। তার পাশাপাশি মাঠে আছেন উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মোঃ আবদুস সালাম মোল্লা, ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মোঃ শফিকুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক মাজারুল ইসলাম খোকা, সাবেক সভাপতি মোঃ ফরিদ সরকার, ভিটিকান্দি ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি মোঃ সুমন আহম্মেদ, বিএনপির সমর্থক ও প্রবাসী মোঃ তাজুদ্দীন ইসলাম ভূঁইয়া, ইউনিয়ন বিএনপির উপদেষ্টা ডাক্তার মোঃ আলী হোসেন এবং মোঃ আলী। এখানে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে কাজ করছেন তিতাস উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি সালাউদ্দিন আহাম্মেদ।
৭নং নারান্দিয়া ইউনিয়নে দলীয় ও সামাজিক প্রভাব বিবেচনায় মূল হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন উপজেলা বিএনপির কৃষি বিষয়ক সম্পাদক হাজী আব্দুল বাতেন সরকার এবং ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মোঃ জহিরুল ইসলাম। এছাড়া দলীয় সমর্থকদের কাছে জোরালো আলোচনায় আছেন সাংগঠনিক সম্পাদক ডাক্তার মোঃ গোলাম মহিউদ্দিন জিলানী। এখানে জামায়াতের পছন্দের তালিকায় রয়েছেন মায়েজ হোসেন বাবু।
৮নং জিয়ারকান্দি ইউনিয়নে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে শীর্ষ হেভিওয়েট হিসেবে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ও সাবেক সফল চেয়ারম্যান মোঃ এমদাদ হোসেন আখন্দ। একইসাথে মাঠে সক্রিয় আছেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোঃ সেলিম মোল্লা, উপজেলা বিএনপির কোষাধ্যক্ষ মোঃ জামাল উদ্দিন, ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মোঃ মুকবুল সরকার এবং সিনিয়র সহ-সভাপতি মোঃ হালিম সরকার।
৯নং মজিদপুর ইউনিয়নে বিএনপির সমর্থনে শক্ত হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে মাঠে দৃশ্যমান ভাবমূর্তি নিয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মোঃ মাজেদুল ইসলাম মন্টু। এছাড়াও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে মাঠে সোচ্চার আছেন উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মোঃ আক্তার বেপারী, মোঃ আশরাফুল আলম, উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক মোঃ মজিবুর রহমান সরকার, সহ-সভাপতি মোঃ শাহ আলম সরকার, সাধারণ সম্পাদক তন্ময় হাসান কাজল এবং মোঃ রিপন সরকার।
তৃণমূলের অগণিত প্রার্থী সামলাতে এবং দলের মধ্যে যাতে কোনো কোন্দল বা গৃহদাহ তৈরি না হয়, সেজন্য স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় কুমিল্লা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া ব্যস্ত সময় পার করছেন। তিনি ইতোমধ্যেই তিতাস উপজেলার চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী ও নয়টি ইউনিয়ন বিএনপির সুপার ফাইভ অর্থাৎ সভাপতি, সহ-সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক নেতাদের সাথে কয়েক দফায় মতবিনিময় করেছেন।
তিতাস উপজেলা বিএনপির সভাপতি মোঃ ওসমান গনি ভূঁইয়া সংবাদমাধ্যমকে জানান, কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী এমপি অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া, থানা কমিটির নেতৃত্ব ও তৃণমূল নেতাদের সমন্বয়ে যোগ্য, জনপ্রিয় ও ত্যাগী নেতাদের বাছাই করে প্রতিটি ইউনিয়নে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে কেউ গেলে ধরে নিতে হবে তিনি দলের লোক নন। দলের চূড়ান্ত নির্দেশনায় স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে, বোর্ডের অনুমোদন পাওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত রাজপথের সব আন্দোলন ও কর্মসূচিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে, এবং যাকে চূড়ান্ত চিঠি দেওয়া হবে তার পক্ষেই সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে নেমে বিজয় ছিনিয়ে আনতে হবে।
বিএনপি যেখানে একাধিক প্রার্থী নিয়ে প্রকাশ্যে তুমুল প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত, জামায়াতে ইসলামী ঠিক বিপরীত কৌশলে হাঁটছে। তিতাসের নয়টি ইউনিয়নের প্রতিটিতেই জামায়াতের একক সমর্থিত প্রার্থী নির্ধারণ করা রয়েছে। তবে কৌশলগত কারণে তারা জনসভা বা প্রকাশ্যে বড় ধরনের শোভাযাত্রা না করে ঘরোয়া বৈঠক ও সুনির্দিষ্ট গোপন আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচনী পরিকল্পনা তৈরি করছে। দলীয় প্রতীক না থাকায় জামায়াত তাদের মনোনীত শিক্ষিত ও সমাজসেবক ভাবমূর্তির সততানির্ভর প্রার্থীকে পরোক্ষ ব্যাকআপ দিয়ে নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রতীকে দাঁড় করাচ্ছে। প্রকাশ্যে শোরগোল কম করে অভ্যন্তরীণ বৈঠকে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের মাধ্যমে দলীয় একক ভোটব্যাংককে পুরোমাত্রায় সচল রেখে নির্বাচনে জয় ছিনিয়ে আনার সুকৌশলী চাল চালছে দলটি।
ইসি ও স্থানীয় প্রশাসন থেকে ইতোমধ্যে সব ধরনের বেআইনি প্রচার, আগাম বিলবোর্ড ও শোডাউনের ওপর কঠোর নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে দলীয় প্রতীক ছাড়া এই নির্বাচনে সাধারণ ভোটাররা দলীয় অন্ধত্বের ঊর্ধ্বে উঠে ব্যক্তির যোগ্যতা, সততা ও এলাকার উন্নয়নে অবদান রাখার সক্ষমতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তরুণ ও সাধারণ ভোটারদের মতে, বিপদে-আপদে যাকে পাশে পাওয়া যায় তাকেই এবার ইউপি চেয়ারম্যান হিসেবে বেছে নেওয়া হবে। নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ভোটের পাঁচ ধাপের তারিখ চূড়ান্ত হওয়া, এমপি সেলিম ভূঁইয়ার কঠোর সাংগঠনিক বার্তা, বিএনপির সুপার ফাইভ কমিটির একক প্রার্থী বাছাইয়ের চ্যালেঞ্জ এবং জামায়াতের গোপন বৈঠক নির্ভর নীরব কৌশল, সব মিলিয়ে তিতাস উপজেলার নয়টি ইউনিয়নের গ্রাম-গঞ্জের রাজনৈতিক আবহাওয়ায় এখন চরম উত্তেজনা ও কৌতুহল বিরাজ করছে।
Reporter Name 























