সিএনএমঃ
সিলেট মহানগরীর বিভিন্ন আবাসিক হোটেলকে ঘিরে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একের পর এক অভিযান, গ্রেপ্তার ও হোটেল সিলগালা করার পরও যেন থামছে না এসব কার্যক্রম। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি হোটেলে অভিযান ও সিলগালার পর অন্য হোটেলে একই ধরনের অভিযোগ সামনে আসছে। এতে নগরবাসীর মধ্যে যেমন উদ্বেগ বাড়ছে, তেমনি প্রশ্ন উঠছে—শুধু অভিযান চালিয়ে ও হোটেল সিলগালা করেই কি এ ধরনের কর্মকাণ্ড স্থায়ীভাবে বন্ধ করা সম্ভব?
সর্বশেষ গত বুধবার (১৯ আগস্ট) বিকেল সোয়া ৫টার দিকে নগরীর রাজার গলি-দরগাহ গেট এলাকার ‘হোটেল নির্জন’ এবং দক্ষিণ সুরমার কদমতলী এলাকার ‘তিতাস হোটেলে’ অভিযান চালায় পুলিশ। এ সময় অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে নারী-পুরুষসহ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে হোটেল দুটি সিলগালা করে দেওয়া হয়।
এ নিয়ে চলতি বছর ও এর আগে বিভিন্ন সময়ে সিলেটে একই অভিযোগে মোট ১৪টি আবাসিক হোটেল সিলগালা করার তথ্য পাওয়া গেছে। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নগরীতে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মহানগরীর বন্দরবাজার, সুরমা পয়েন্ট, তালতলা, শেখঘাট, রিকাবীবাজার, আম্বরখানা, শাহজালাল (রহ.) দরগাহ গেট, জিন্দাবাজার, সোবহানীঘাট, নাইওরপুল, শিবগঞ্জ, দক্ষিণ সুরমার কদমতলী, হুমায়ুন রশীদ চত্বর ও লাউয়াইসহ বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে একাধিক আবাসিক হোটেল। এসব হোটেলের কয়েকটিকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ রয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
গত ২৩ জুন সিলেট মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) নগরীর দুটি আবাসিক হোটেলে অভিযান চালায়। এ সময় অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ছয়জনকে আটক করা হয়। পরে কোতোয়ালি থানার তালতলা এলাকার ‘রহমানিয়া বোডিং’ ও ‘ছাদী গেস্ট হাউজ’ সিলগালা করা হয়।
এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারির শুরুতে বন্দরবাজার এলাকার ‘তালহা রেস্ট হাউজে’ অভিযান চালানো হয়। এপ্রিল মাসে লালবাজার এলাকার ‘এলাহী আবাসিক হোটেল’, ‘হোটেল অতিথি’ ও ‘হোটেল সুফিয়া’তে অভিযান পরিচালনা করে পুলিশ। একই ধারাবাহিকতায় গত ২ জুন আম্বরখানা এলাকার ‘নিউ হোটেল লেমন গার্ডেনে’ অভিযান চালানো হয়। এসব অভিযানে প্রায় অর্ধশত তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতী ও নারী-পুরুষকে আটক করা হয় বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। পরে সংশ্লিষ্ট হোটেলগুলো সিলগালা করা হয়।
২০২৫ সালের ২৪ অক্টোবর মহানগরীর দক্ষিণ সুরমার ‘সিলেট রেস্ট হাউজ’, তালতলা এলাকার ‘হোটেল বিলাশ’, দক্ষিণ সুরমার ‘গ্রান্ড সাওদা’ ও ‘আল সাদী হোটেলে’ অভিযান চালায় পুলিশ। এ সময় অভিযোগে জড়িতদের আটক করার পাশাপাশি হোটেলগুলো সিলগালা করা হয়।
একই বছরের নভেম্বরের শুরুতে জিন্দাবাজার এলাকার ‘হোটেল রাজমনীতে’ অভিযান চালিয়ে তিনজনকে আটক করে পুলিশ। পরে হোটেলটিও সিলগালা করা হয়।
এর আগে ২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি আম্বরখানা এলাকার ‘হোটেল নূরানী’ ও ‘হোটেল আলীবাবায়’ অভিযান চালানো হয়। ওই অভিযানে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে চারজনকে আটক করে পুলিশ।
একাধিক হোটেলে ধারাবাহিক অভিযান চালানোর পরও একই ধরনের অভিযোগ সামনে আসায় বিষয়টি নিয়ে নগরবাসীর মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সচেতন নাগরিকদের মতে, কোনো হোটেলে অপরাধমূলক বা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ প্রমাণিত হলে শুধু সেখানে অভিযান চালিয়ে সিলগালা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। হোটেল মালিক, ব্যবস্থাপক ও সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা তদন্ত করে দেখা এবং প্রয়োজন হলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
নগরীর কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, “হোটেল সিলগালা করার পর কিছুদিন পরিস্থিতি শান্ত থাকে। কিন্তু পরে অন্য কোনো হোটেলে একই অভিযোগ দেখা যায়। তাই শুধু অভিযান নয়, এসব কর্মকাণ্ডের মূল কারণ ও পেছনের ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।”
আরেকজন সচেতন নাগরিকের ভাষ্য, “আবাসিক হোটেল পরিচালনার ক্ষেত্রে নিয়ম-কানুন ও পরিচয় যাচাই কঠোরভাবে নিশ্চিত করা দরকার। একই সঙ্গে নিয়মিত নজরদারি থাকলে হোটেলের আড়ালে কেউ অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ কমবে।”
নগরবাসীর আরও দাবি, আবাসিক হোটেলগুলোর লাইসেন্স, অতিথিদের তথ্য সংরক্ষণ, পরিচয় যাচাই ও হোটেল ব্যবস্থাপনার কার্যক্রম নিয়মিত মনিটরিং করা প্রয়োজন। পাশাপাশি কোনো হোটেলের বিরুদ্ধে বারবার অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
সিলেট মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মো. মনজুরুল আলম বলেন, “মহানগরীতে অসামাজিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন হোটেলে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি জড়িত হোটেলগুলো সিলগালা করা হচ্ছে।”
ধারাবাহিক অভিযানের পরও কেন একই ধরনের অভিযোগ বারবার সামনে আসছে—এ প্রশ্নের কার্যকর উত্তর খুঁজতে হলে হোটেল মালিকদের পাশাপাশি ব্যবস্থাপনা, লাইসেন্সিং ব্যবস্থা, নজরদারি ও স্থানীয় পর্যায়ের তদারকিও গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন নগরবাসী।
জনসাধারণের প্রত্যাশা, সিলেটের আবাসিক হোটেলগুলো যেন বৈধ ও নিরাপদ আবাসনসেবা দেওয়ার জায়গা হিসেবে পরিচালিত হয়। আর কোনো হোটেল যদি সত্যিই অপরাধ বা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের আড়ালে পরিণত হয়, তাহলে সাময়িক অভিযান নয়—দায়ীদের শনাক্ত করে কার্যকর ও স্থায়ী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
Reporter Name 























