আরমান হোসেন রাজুঃ
বর্ষা এলেই তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, ধরলা ও দুধকুমার নদীর চরাঞ্চল এবং নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চল বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়। চারদিকে থৈথৈ পানি, ডুবে যায় আঙিনা, ফসলি জমি ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। কিন্তু এই পানির মাঝেও ছোট ছোট দ্বীপের মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে একেকটি ক্লাস্টার বসতভিটা। সমতল ভূমি থেকে প্রায় ৬ থেকে ৭ ফুট উঁচু করে নির্মাণ করা এসব বসতভিটা শুধু কয়েকটি পরিবারের নিরাপদ আশ্রয়ই নয়, বরং বন্যাকালে পুরো গ্রামের জন্য অস্থায়ী ‘ফ্লাড সেন্টার’ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
চরাঞ্চলে এককভাবে এত বড় উঁচু বসতভিটা নির্মাণ করা অধিকাংশ পরিবারের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই ৩ থেকে ৭টি পরিবার একত্রিত হয়ে ১০ থেকে ২০ শতাংশ জমির ওপর এসব ক্লাস্টার বসতভিটা তৈরি করে। প্রতিটি বসতভিটা নির্মাণে ব্যয় হয় প্রায় ৬ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা। কোথাও কোথাও সরকারি কিংবা বেসরকারি সংস্থার সহায়তা মিললেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিজেদের অর্থায়নে এসব বসতভিটা গড়ে তুলছেন চরবাসী।
কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার ব্রহ্মপুত্র তীরবর্তী জোরগাছ এলাকার প্রবীণ কৃষক বলেন, সাত-আট বছর আগেও তাদের এলাকায় ক্লাস্টার বসতভিটার প্রচলন ছিল না। এখন গ্রামটির প্রায় ২০০ পরিবারের মধ্যে অন্তত ১৫০টি পরিবার ক্লাস্টার বসতভিটায় বসবাস করছে।
স্থানীয় কৃষক বলেন, “আমরা পাঁচটি পরিবার মিলে ১৮ শতাংশ জমির ওপর চার বছর আগে একটি ক্লাস্টার বসতভিটা তৈরি করেছি। এটি সমতল থেকে প্রায় সাত ফুট উঁচু। নির্মাণে প্রায় ৯ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এখন বন্যায় চারদিকে পানি উঠলেও আমাদের বসতভিটা নিরাপদ থাকে। শুধু আমরা নই, আশপাশের যেসব পরিবারের বসতভিটা পানিতে ডুবে যায়, তারাও গরু-ছাগল নিয়ে এখানে আশ্রয় নেয়।”
স্থানীয় মুরব্বিরা জানান, আর্থিক সংকটের কারণে তিনি এখনো ক্লাস্টার বসতভিটা নির্মাণ করতে পারেননি। প্রতিবছর বন্যার সময় পরিবারের সদস্য ও গবাদিপশু নিয়ে প্রতিবেশীদের ক্লাস্টার বসতভিটায় আশ্রয় নিতে হয়।
বয়স্ক মুরব্বি বলেন, “এককভাবে এত বড় বসতভিটা তৈরি করা সম্ভব নয়। প্রতিবেশী আরও তিনটি পরিবারের সঙ্গে কথা হয়েছে। চলতি শুষ্ক মৌসুমে আমরা চার পরিবার মিলে একটি ক্লাস্টার বসতভিটা তৈরি করব। আমাদের চর এলাকায় এগুলো এখন কার্যত ফ্লাড সেন্টার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।”
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তিস্তাপাড়ের হরিপুর এলাকার কৃষকরা বলেন, তাদের এলাকা এখনো বন্যার পানিতে নিমজ্জিত। চারদিকে শুধু পানি, কিন্তু ক্লাস্টার বসতভিটাগুলো শুকনো ও নিরাপদ রয়েছে।
কৃষকরা জানান, তাদের এলাকায় ৭০টি পরিবার ১৮টি ক্লাস্টার বসতভিটায় বসবাস করছে। বর্ষাকালে প্রায় চার থেকে পাঁচ মাস এলাকা পানির নিচে থাকে।
স্থানীয় এলাকাবাসীরা বলেন, “বসতভিটায় নিরাপদে থাকতে পারলেও চলাচলই সবচেয়ে বড় সমস্যা। মূল ভূখণ্ডে যেতে কলাগাছের ভেলা, প্লাস্টিকের ড্রাম দিয়ে তৈরি ভুরা কিংবা নৌকার ওপর নির্ভর করতে হয়। শিশু, বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ—সবাই এভাবেই চলাচলে অভ্যস্ত হয়ে গেছে।”
লালমনিরহাট সদর উপজেলার ধরলাপাড়ের দীপচর ফলিমারী গ্রামে প্রায় ৩০০ পরিবারের বসবাস। এর মধ্যে প্রায় ২০০টি পরিবার ক্লাস্টার বসতভিটায় বাস করছে। বাকি প্রায় ১০০টি পরিবার অর্থের অভাবে এখনো এমন বসতভিটা নির্মাণ করতে পারেনি।
চর ফলিমারীর কৃষকরা বলেন, ক্লাস্টার বসতভিটা নির্মাণের আগে বন্যা এলেই তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠত। এখন পরিস্থিতি অনেক বদলেছে। “ভূমিহীন পরিবারগুলোও খাস জমিতে ক্লাস্টার বসতভিটা তৈরি করে বসবাস করছে। সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতাও পেয়েছে অনেকেই। বসতভিটার চারপাশে আম, কাঁঠাল, কলা, পেঁপেসহ বিভিন্ন ফলের গাছ লাগিয়েছি। পাশাপাশি নানা ধরনের সবজি চাষও করি। সবাই মিলেমিশে বসবাস করি।”
চরাঞ্চলের জীবন-জীবিকা নিয়ে কাজ করা কুড়িগ্রামের একটি বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধি আহসানুল কবীর বুলু বলেন, নদীভাঙন ও বন্যাপ্রবণ চরাঞ্চলে ক্লাস্টার বসতভিটা এখন একটি কার্যকর অভিযোজন পদ্ধতি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। “ভূমিহীন পরিবারগুলো সরকারি ও বেসরকারি সহায়তায় এসব বসতভিটা নির্মাণ করছে। তবে অধিকাংশ পরিবার নিজেদের অর্থেই এগুলো গড়ে তুলছে। বসতভিটাগুলো সমতল থেকে ছয় থেকে সাত ফুট উঁচু হওয়ায় সাধারণ বন্যায় পানি ওঠে না। ফলে পরিবারগুলো নিরাপদ থাকে এবং গবাদিপশুও রক্ষা পায়।”
লালমনিরহাট জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আব্দুল মতিন বলেন, চর ও নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের ক্লাস্টার বসতভিটাগুলো বর্তমানে স্থানীয় পর্যায়ে ‘ফ্লাড সেন্টার’ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। “কয়েকটি পরিবার একত্রিত হয়ে ক্লাস্টার বসতভিটা নির্মাণের আবেদন করলে সরকারি সহায়তা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ভূমিহীন ও অতি দরিদ্র পরিবারগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।”
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, পরিকল্পিতভাবে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে ক্লাস্টার বসতভিটা নির্মাণ করায় এগুলো তুলনামূলকভাবে নদীভাঙনের ঝুঁকি কম থাকে। এছাড়া ওপরের স্তরে এঁটেল মাটি ব্যবহার করায় মাটির স্থায়িত্ব বাড়ে এবং বিভিন্ন ধরনের ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছ রোপণ করা সম্ভব হয়। প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উত্তরাঞ্চলে বন্যা ও নদীভাঙনের ঝুঁকি বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে ক্লাস্টার বসতভিটা শুধু নিরাপদ আবাসন নয়, বরং চরাঞ্চলের মানুষের জন্য একটি টেকসই দুর্যোগ-সহনশীল জীবনযাপনের মডেল হিসেবে ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে।
Reporter Name 














