দুষ্কৃতকারীদের’ গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলার হুকুমদাতা নোয়াখালী-১ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) এইচএম ইব্রাহিমের সেই বক্তব্য নিয়ে বিভিন্ন মহলে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। একজন জনপ্রতিনিধি বা আইনপ্রণেতা হয়ে প্রকাশ্যে এভাবে ‘দুষ্কৃতকারীদের’ গণপিটুনি দিয়ে মানুষ হত্যার হুকুম দেওয়া বিষয়টিকে চরম আপত্তিজনক ও রীতিমতো বিভীষিকাময় বলেও মন্তব্য করেছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা।
সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীরা বলেছেন, একজন জনপ্রতিনিধি বা আইনপ্রণেতা হয়ে আইন হাতে তুলে নিতে উদ্বুদ্ধ করায় বিধান অনুসারে এমপি ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তা না হলে দুঃখ প্রকাশের মাধ্যমে ছাড় পেয়ে গেলে পরবর্তী সময়ে অন্যরাও উৎসাহী হবেন।
এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী কমিটির সাবেক মহাসচিব নূর খান লিটন বলেন, আইনকে নিজের হাতে তুলে নেওয়ার কারও সুযোগ নেই। কিন্তু আমাদের নীতিনির্ধারকরাই যখন এই ধরনের কথা (গণপিটুনিতে মেরে ফেলা) বলেন, তখন সমাজে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এমনি আমরা দেখছি, অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আইন-আদালতকে তোয়াক্কা না করে অনেক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। সেখানে নীতিনির্ধারকরা যখন এ ধরনের বেআইনি কথা বলতে থাকেন, তখন সমাজে খারাপ প্রভাব পড়তে বাধ্য। আসলে নৈতিকতাবর্জিত রাজনীতি আমাদেরকে আজকে এই জায়গায় দাঁড় করিয়েছে। এই জায়গা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য আদর্শিক একটি সংগ্রাম গড়ে তোলা দরকার। এ ছাড়া এখান থেকে বের হওয়ার সুযোগ নেই।
নূর খান লিটন আরও বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, যেকোনো মানুষ যখন আইনকে তোয়াক্কা করেন না, আইনকে পাশ কাটান বা আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তার বক্তব্য দেন বা কার্যক্রম করেন, তখন তার বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ারও সুযোগ রয়েছে।
একই প্রসঙ্গে সামাজিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির অন্যতম কাজ হলো আইন প্রণয়ন, রাষ্ট্রের কার্যকরী উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করা। দলমত নির্বিশেষে সবার জানমালের নিরাপত্তা দেওয়া। কিন্তু কোনো সংসদ সদস্য রাগ হয়ে বা আবেগতাড়িত হয়ে ধ্বংসযজ্ঞ-উশৃঙ্খল আচরণ হতে পারে এমন কিছু করলে অপরাধ বা অপরাধীদের আস্ফালন অনেক বেড়ে যায়। এমন হতে পারে, তিনি যেটি বোঝাতে চেয়েছেন সেটি বলতে পারেননি। যাই হোক, তার ব্যবহৃত শব্দগুলো চরম আপত্তিজনক ও বিভীষিকাময়। এ ছাড়া একজন সংসদ সদস্য এমন শব্দ ব্যবহার করলে তাদের প্রতি নাগরিকদের আস্থা বা দেশের প্রতি দায়বদ্ধতার জায়গাগুলো শিথিল হয়ে পড়ে, যা কোনোভাবে মানার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, এই সদস্যকে সংশোধনের জন্য করণীয় কী, রাজনীতিকে কীভাবে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা যায়- সেগুলো নিয়ে সজাগ করা যেতে পারে। বর্তমান সংসদের প্রধান দলনেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানুষের কল্যাণে রাজনীতিকে ব্যবহার করেন। এক্ষেত্রে তার অধীনের সংসদ সদস্যরা কেন এমনটি চিন্তা করছেন সেটি ভেবে দেখা জরুরি।
এই সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক আরও বলেন, ওই এমপিকে একেবারে অভিযোগ থেকে মুক্ত করা ঠিক হবে না। তাতে অন্য সদস্যদের মধ্যে এ আচরণের প্রভাব বিস্তার করতে পারে। তাকে শোকজ করা যেতে পারে বা একটি প্রক্রিয়ার মধ্যে নিয়ে এসে তার কাছ এ বিষয়ে জানা উচিত এবং তার প্রত্যুত্তরের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া সংসদ পরিচালনার যে রীতি সে সম্পর্কে তার ধারণা নেই বলে মনে হয়েছে। এক্ষেত্রে সিনিয়র সদস্যদের মাধ্যমে তার শেখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
জানা যায়, গত শুক্রবার রাতে সোনাইমুড়ীতে স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত স্মরণসভায় নোয়াখালী-১ (চাটখিল-সোনাইমুড়ী) আসনের এমপি ইব্রাহিম বলেন, দুষ্কৃতকারীদের যেখানেই পাবেন গণপিটুনি দিয়ে জায়গায় মেরে ফেলবেন। কেউ মামলা করলে সেটা আমি বুঝব। প্রয়োজনে আমি হুকুমের আসামি হব। আপনাদের কিছুই হবে না।’ তার এ বক্তব্যটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে শনিবার এ বিষয়ে এমপি ইব্রাহিম দুঃখপ্রকাশ করেন বলে জানা যায়। কিন্তু একজন আইনপ্রণেতা হয়ে প্রকাশ্যে এভাবে গণপিটুনি দিয়ে মানুষ হত্যার হুকুম দেওয়ায় সব মহলেই শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা। এমন বক্তব্য দিয়ে স্থানীয় জনমনেও আতঙ্ক সৃষ্টি করেছেন বলে জানান স্থানীয়রা।
Reporter Name 

























