ঢাকা ০৪:৪৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘স্ত্রী বহন’ প্রতিযোগিতার পুরস্কার সঙ্গীনীর ওজনের সমান বিয়ার!

  • Reporter Name
  • আপডেট সময় ০২:৫২:১৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

সিএনএম ডেস্কঃ

দাম্পত্য জীবনের সুখে-দুঃখে একে অপরের পাশে থাকার অঙ্গীকার আমরা অনেকেই শুনি, কিন্তু স্ত্রীকে সোজা পিঠে বা কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে দুর্গম ট্র্যাকে অবিশ্বাস্য দৌড় দেওয়ার দৃশ্য সচরাচর দেখা যায় না। ফিনল্যান্ডের শান্ত ও নিরিবিলি শহর সোনকাজারভিতে প্রতি বছর জুলাই মাসে যখন ‘ওয়াইফ ক্যারিং ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ’ বা বউ কোলে দৌড় প্রতিযোগিতা শুরু হয়, তখন পুরো বিশ্ব যেন এক অনন্য উন্মাদনায় মেতে ওঠে। সাধারণ কোনো সমতল ট্র্যাকে এই দৌড় অনুষ্ঠিত হয় না। ২৫৩ দশমিক ৫ মিটার দীর্ঘ এই ট্র্যাকে প্রতিযোগীদের জন্য ওত পেতে থাকে বালুর উঁচু ঢাল, কাঠের বিশালাকার বাধা এবং প্রায় কোমর সমান গভীর বিষাক্ত কাদাপানির গর্ত। আর এই সমস্ত দুর্গম বাঁধা পার হতে হয় নিজের সঙ্গিনীকে বিচিত্র সব কৌশলে শরীরে শক্ত করে জড়িয়ে রেখে। দৌড়ের সময় সামান্য অসাবধানতায় হাত ফসকে সঙ্গী নিচে পড়ে গেলেই তাকে আবার দ্রুত তুলে নিয়ে দৌড় শুরু করতে হয়। বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাওয়া এই অদ্ভুত প্রতিযোগিতায় বিজয়ী জুটির জন্য অপেক্ষা করে রাজকীয় ট্রফি। জয়ী সঙ্গীনীর ঠিক যত কেজি ওজন, উপহার হিসেবে তাকে দেওয়া হয় ঠিক তত লিটার হিমশীতল বিয়ার।

অ্যাথলেটদের মতো কঠিন প্রস্তুতি ও কৌশল ‘এস্তোনিয়ান ক্যারি’

প্রথম দর্শনে এটিকে কেবল হাসিকৌতুক কিংবা নিছক বিনোদন মনে হলেও, প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া অ্যাথলেটদের কাছে এটি চরম সম্মান ও শারীরিক সক্ষমতার লড়াই। শিরোপা নিজেদের নামে করতে প্রতিযোগীরা বছরজুড়ে পেশাদার ক্রীড়াবিদদের মতো কঠোর শারীরিক কসরত, দৌড় এবং ভারসাম্য রক্ষার কঠোর প্রশিক্ষণ নেন। প্রতিযোগিতার ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সফল বহনের কৌশলটির নাম ‘এস্তোনিয়ান ক্যারি’। এই কৌশলে নারী তার মাথা নিচের দিকে রেখে পুরুষের পিঠের ওপর উল্টো হয়ে ঝুলে থাকেন, আর পা দুটি পুরুষের ঘাড় ও কাঁধে শক্ত করে পেঁচিয়ে রাখেন। এতে দৌড়বিদ দুই হাত সম্পূর্ণ খালি রেখে দ্রুত ভারসাম্য বজায় রেখে দৌড়াতে পারেন। এছাড়া ফায়ারম্যানস ক্যারি বা পিঠে নেওয়ার ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিও অনেকে ব্যবহার করেন, তবে গতি ও ভারসাম্যের দিক থেকে এস্তোনিয়ান কায়দাই বরাবরের মতো চ্যাম্পিয়নদের প্রথম পছন্দ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

এই অদ্ভুত প্রতিযোগিতার উৎপত্তির পেছনে জড়িয়ে আছে ফিনল্যান্ডের উনিশ শতকের এক রোমাঞ্চকর লোকগাথা। বলা হয়ে থাকে, ‘রঙ্কাইনেন দ্য রবার’ নামের এক কুখ্যাত দস্যু ও তার দল আশেপাশের গ্রামগুলো থেকে নারী ও সম্পদ চুরি করে বনে পালিয়ে যেত। দস্যুদলে যোগ দেওয়ার আগে অনুসারীদের কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হতো, যেখানে ভারী বোঝা কাঁধে নিয়ে দুর্গম পথ অতিক্রম করে নিজেদের শক্তির প্রমাণ দিতে হতো। সেই প্রাচীন রোমাঞ্চকর ইতিহাস ও রূপকথাকে ১৯৯২ সালে এক নতুন সামাজিক রূপ দেয় ফিনল্যান্ড। প্রাচীনকালের কনে অপহরণের সেই রোমহর্ষক গল্প কালক্রমে রূপ নেয় পারস্পরিক ভালোবাসা, আনন্দ এবং শারীরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের বিশ্বখ্যাত উৎসবে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ফিনল্যান্ডের এই উদ্ভাবনী আয়োজন বিশ্ব সংস্কৃতির এক অন্যতম প্রধান আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।

প্রতিযোগিতার কড়া নিয়মকানুন এবং কনে চুরির ব্যতিক্রমী স্বাধীনতা

যেকোনো পেশাদার খেলার মতোই বউ কোলে দৌড় প্রতিযোগিতারও রয়েছে কড়া আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি। নাম ‘বউ কোলে দৌড়’ হলেও নিয়মানুযায়ী সঙ্গিনীকে আপনার সত্যিকারের বিবাহিত স্ত্রী হতেই হবে এমন কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। প্রতিযোগী চাইলে প্রতিবেশী, বন্ধু কিংবা পরিচিত যেকোনো নারীকে নিজের সঙ্গিনী হিসেবে বেছে নিতে পারেন। তবে শর্ত হচ্ছে নারী সঙ্গীনীর বয়স অন্তত ১৭ বছর হতে হবে এবং তার সর্বনিম্ন ওজন হতে হবে ৪৯ কেজি। যদি কোনো নারীর ওজন ৪৯ কেজির কম হয়, তবে নিয়ম মেলাতে তার পিঠে সমপরিমাণ ওজনের একটি বাড়তি ব্যাগ চাপিয়ে দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়, যাতে কোনো প্রতিযোগী বাড়তি সুবিধা না পান। অন্যদিকে সঙ্গিনী যত বেশি ভারী হবেন, বিজয়ী হলে ঘরে বিয়ার নিয়ে যাওয়ার পরিমাণও ঠিক ততটাই বেড়ে যাবে।

কাদা মেখে হাসিমুখে বিজয়ের পরম আনন্দে ঘরে ফেরা

কাদাপানিতে মাখামাখি হয়ে এবং ঘামে ভেজা শরীরে সব বাধা পেরিয়ে যখন কোনো জুটি ফিনিশিং লাইন স্পর্শ করে, তখন গ্যালারিতে থাকা হাজার হাজার দর্শকের করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো চত্বর। ওজনের মাপে বিয়ার মেপে নেওয়ার সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি উদযাপন করতে বিজয়ীদের পাশাপাশি পরাজিত জুটির মুখেও ফুটে ওঠে এক অনাবিল প্রাপ্তির হাসি। জীবনসঙ্গীকে কাঁধে তুলে নিয়ে এমন চ্যালেঞ্জিং ট্র্যাকে বিজয় ছিনিয়ে আনার আনন্দ পৃথিবীর অন্য যেকোনো অর্জনের চেয়ে অনেক বেশি মিষ্টি ও চিরস্মরণীয় হয়ে থাকে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

CrimeNews Media24

জনপ্রিয় সংবাদ

‘স্ত্রী বহন’ প্রতিযোগিতার পুরস্কার সঙ্গীনীর ওজনের সমান বিয়ার!

আপডেট সময় ০২:৫২:১৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সিএনএম ডেস্কঃ

দাম্পত্য জীবনের সুখে-দুঃখে একে অপরের পাশে থাকার অঙ্গীকার আমরা অনেকেই শুনি, কিন্তু স্ত্রীকে সোজা পিঠে বা কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে দুর্গম ট্র্যাকে অবিশ্বাস্য দৌড় দেওয়ার দৃশ্য সচরাচর দেখা যায় না। ফিনল্যান্ডের শান্ত ও নিরিবিলি শহর সোনকাজারভিতে প্রতি বছর জুলাই মাসে যখন ‘ওয়াইফ ক্যারিং ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ’ বা বউ কোলে দৌড় প্রতিযোগিতা শুরু হয়, তখন পুরো বিশ্ব যেন এক অনন্য উন্মাদনায় মেতে ওঠে। সাধারণ কোনো সমতল ট্র্যাকে এই দৌড় অনুষ্ঠিত হয় না। ২৫৩ দশমিক ৫ মিটার দীর্ঘ এই ট্র্যাকে প্রতিযোগীদের জন্য ওত পেতে থাকে বালুর উঁচু ঢাল, কাঠের বিশালাকার বাধা এবং প্রায় কোমর সমান গভীর বিষাক্ত কাদাপানির গর্ত। আর এই সমস্ত দুর্গম বাঁধা পার হতে হয় নিজের সঙ্গিনীকে বিচিত্র সব কৌশলে শরীরে শক্ত করে জড়িয়ে রেখে। দৌড়ের সময় সামান্য অসাবধানতায় হাত ফসকে সঙ্গী নিচে পড়ে গেলেই তাকে আবার দ্রুত তুলে নিয়ে দৌড় শুরু করতে হয়। বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাওয়া এই অদ্ভুত প্রতিযোগিতায় বিজয়ী জুটির জন্য অপেক্ষা করে রাজকীয় ট্রফি। জয়ী সঙ্গীনীর ঠিক যত কেজি ওজন, উপহার হিসেবে তাকে দেওয়া হয় ঠিক তত লিটার হিমশীতল বিয়ার।

অ্যাথলেটদের মতো কঠিন প্রস্তুতি ও কৌশল ‘এস্তোনিয়ান ক্যারি’

প্রথম দর্শনে এটিকে কেবল হাসিকৌতুক কিংবা নিছক বিনোদন মনে হলেও, প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া অ্যাথলেটদের কাছে এটি চরম সম্মান ও শারীরিক সক্ষমতার লড়াই। শিরোপা নিজেদের নামে করতে প্রতিযোগীরা বছরজুড়ে পেশাদার ক্রীড়াবিদদের মতো কঠোর শারীরিক কসরত, দৌড় এবং ভারসাম্য রক্ষার কঠোর প্রশিক্ষণ নেন। প্রতিযোগিতার ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সফল বহনের কৌশলটির নাম ‘এস্তোনিয়ান ক্যারি’। এই কৌশলে নারী তার মাথা নিচের দিকে রেখে পুরুষের পিঠের ওপর উল্টো হয়ে ঝুলে থাকেন, আর পা দুটি পুরুষের ঘাড় ও কাঁধে শক্ত করে পেঁচিয়ে রাখেন। এতে দৌড়বিদ দুই হাত সম্পূর্ণ খালি রেখে দ্রুত ভারসাম্য বজায় রেখে দৌড়াতে পারেন। এছাড়া ফায়ারম্যানস ক্যারি বা পিঠে নেওয়ার ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিও অনেকে ব্যবহার করেন, তবে গতি ও ভারসাম্যের দিক থেকে এস্তোনিয়ান কায়দাই বরাবরের মতো চ্যাম্পিয়নদের প্রথম পছন্দ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

এই অদ্ভুত প্রতিযোগিতার উৎপত্তির পেছনে জড়িয়ে আছে ফিনল্যান্ডের উনিশ শতকের এক রোমাঞ্চকর লোকগাথা। বলা হয়ে থাকে, ‘রঙ্কাইনেন দ্য রবার’ নামের এক কুখ্যাত দস্যু ও তার দল আশেপাশের গ্রামগুলো থেকে নারী ও সম্পদ চুরি করে বনে পালিয়ে যেত। দস্যুদলে যোগ দেওয়ার আগে অনুসারীদের কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হতো, যেখানে ভারী বোঝা কাঁধে নিয়ে দুর্গম পথ অতিক্রম করে নিজেদের শক্তির প্রমাণ দিতে হতো। সেই প্রাচীন রোমাঞ্চকর ইতিহাস ও রূপকথাকে ১৯৯২ সালে এক নতুন সামাজিক রূপ দেয় ফিনল্যান্ড। প্রাচীনকালের কনে অপহরণের সেই রোমহর্ষক গল্প কালক্রমে রূপ নেয় পারস্পরিক ভালোবাসা, আনন্দ এবং শারীরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের বিশ্বখ্যাত উৎসবে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ফিনল্যান্ডের এই উদ্ভাবনী আয়োজন বিশ্ব সংস্কৃতির এক অন্যতম প্রধান আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।

প্রতিযোগিতার কড়া নিয়মকানুন এবং কনে চুরির ব্যতিক্রমী স্বাধীনতা

যেকোনো পেশাদার খেলার মতোই বউ কোলে দৌড় প্রতিযোগিতারও রয়েছে কড়া আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি। নাম ‘বউ কোলে দৌড়’ হলেও নিয়মানুযায়ী সঙ্গিনীকে আপনার সত্যিকারের বিবাহিত স্ত্রী হতেই হবে এমন কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। প্রতিযোগী চাইলে প্রতিবেশী, বন্ধু কিংবা পরিচিত যেকোনো নারীকে নিজের সঙ্গিনী হিসেবে বেছে নিতে পারেন। তবে শর্ত হচ্ছে নারী সঙ্গীনীর বয়স অন্তত ১৭ বছর হতে হবে এবং তার সর্বনিম্ন ওজন হতে হবে ৪৯ কেজি। যদি কোনো নারীর ওজন ৪৯ কেজির কম হয়, তবে নিয়ম মেলাতে তার পিঠে সমপরিমাণ ওজনের একটি বাড়তি ব্যাগ চাপিয়ে দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়, যাতে কোনো প্রতিযোগী বাড়তি সুবিধা না পান। অন্যদিকে সঙ্গিনী যত বেশি ভারী হবেন, বিজয়ী হলে ঘরে বিয়ার নিয়ে যাওয়ার পরিমাণও ঠিক ততটাই বেড়ে যাবে।

কাদা মেখে হাসিমুখে বিজয়ের পরম আনন্দে ঘরে ফেরা

কাদাপানিতে মাখামাখি হয়ে এবং ঘামে ভেজা শরীরে সব বাধা পেরিয়ে যখন কোনো জুটি ফিনিশিং লাইন স্পর্শ করে, তখন গ্যালারিতে থাকা হাজার হাজার দর্শকের করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো চত্বর। ওজনের মাপে বিয়ার মেপে নেওয়ার সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি উদযাপন করতে বিজয়ীদের পাশাপাশি পরাজিত জুটির মুখেও ফুটে ওঠে এক অনাবিল প্রাপ্তির হাসি। জীবনসঙ্গীকে কাঁধে তুলে নিয়ে এমন চ্যালেঞ্জিং ট্র্যাকে বিজয় ছিনিয়ে আনার আনন্দ পৃথিবীর অন্য যেকোনো অর্জনের চেয়ে অনেক বেশি মিষ্টি ও চিরস্মরণীয় হয়ে থাকে।