দলের ভেতরে গণতন্ত্র না থাকলে রাষ্ট্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়
Philosopher Deshbandhu Advocate A. N. M. Essa
গণতন্ত্র শুধু পাঁচ বছর পরপর ভোট দেওয়ার নাম নয়। গণতন্ত্র মানে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, ভিন্নমতকে সম্মান করা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং জনগণের কাছে জবাবদিহিতা।
আমার মতে, রাজনৈতিক দলের ভেতরেই যদি গণতন্ত্রের চর্চা না থাকে, তাহলে সেই দল রাষ্ট্রক্ষমতায় গিয়ে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবে, এমন আশা করা যৌক্তিক নয়।
কারণ রাজনৈতিক দলই হচ্ছে রাষ্ট্র পরিচালনার নেতৃত্ব তৈরির প্রধান ক্ষেত্র। সেখানে যদি একজন বা কয়েকজনের সিদ্ধান্তই শেষ কথা হয়, তৃণমূলের মতামত মূল্য না পায়, নেতৃত্ব নির্বাচন স্বচ্ছ না হয় এবং ভিন্নমত প্রকাশ করলে শাস্তির ভয় থাকে, তাহলে সেই সংস্কৃতিই শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রতিফলিত হবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের দুর্বলতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা ও জনআলোচনা রয়েছে।
সংসদ স্বাধীন না হলে গণতন্ত্র অসম্পূর্ণ
সংসদ জনগণের প্রতিনিধিদের প্রতিষ্ঠান। সেখানে একজন সংসদ সদস্যের কাজ শুধু দলীয় সিদ্ধান্তে হাত তোলা নয়। তার কাজ হলো আইন পরীক্ষা করা, সরকারের ভুল ধরিয়ে দেওয়া, নিজের এলাকার মানুষের কথা বলা এবং প্রয়োজনে নিজের দলের সিদ্ধান্তকেও প্রশ্ন করা।
কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭০ অনুযায়ী, রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে নির্বাচিত একজন সংসদ সদস্য দল থেকে পদত্যাগ করলে বা সংসদে দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তার আসন শূন্য হওয়ার বিধান রয়েছে। তাই একে সাধারণত anti-defection provision বলা হয়। সাম্প্রতিক আইনগত বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, এই বিধান সংসদ সদস্যের স্বাধীন ভোটদানের ক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত করে।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার: সাধারণ আলোচনায় অনেকেই “৭০(খ)” বলেন, কিন্তু বর্তমান বিতর্কের মূল বিষয় হলো সামগ্রিকভাবে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ, বিশেষ করে দলবিরোধী ভোটের কারণে আসন হারানোর বিধান।
তাহলে সমস্যা কোথায়?
ধরুন, সরকার একটি আইন সংসদে আনল। ক্ষমতাসীন দলের একজন সংসদ সদস্য মনে করেন আইনটি তার নির্বাচনী এলাকার মানুষের জন্য ক্ষতিকর।
তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে আপত্তি জানাতে পারেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভোটের সময় যদি দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়ায় নিজের আসন হারানোর ঝুঁকি থাকে, তাহলে তার স্বাধীন সিদ্ধান্ত বাস্তবে সীমিত হয়ে যায়।
তখন প্রশ্ন আসে:
তিনি জনগণের প্রতিনিধি, নাকি শুধু দলের প্রতিনিধি?
সংসদীয় বিতর্কের আসল অর্থ তখনই থাকে, যখন বিতর্কের ফলে একজন সদস্য নিজের মত পরিবর্তন করতে পারেন এবং ভোটেও সেই মত প্রকাশ করতে পারেন। International IDEA-র সাম্প্রতিক সাংবিধানিক বিশ্লেষণেও শক্তিশালী anti-defection বিধান আইনসভার আলোচনা, নির্বাহী তদারকি ও জবাবদিহিকে দুর্বল করতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ৭০ অনুচ্ছেদের পেছনেও একটি যুক্তি আছে
৭০ অনুচ্ছেদ একেবারে কারণ ছাড়া তৈরি হয়নি। এর উদ্দেশ্য ছিল দলবদল, অর্থের বিনিময়ে ভোট পরিবর্তন এবং ঘনঘন সরকার পতনের মতো রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ঠেকানো। এই যুক্তিকে একেবারে অস্বীকার করা যায় না।
সুতরাং প্রশ্ন শুধু “৭০ অনুচ্ছেদ থাকবে না থাকবে” নয়।
প্রকৃত প্রশ্ন হলো:
কীভাবে সরকারকে স্থিতিশীল রেখেও সংসদ সদস্যদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা যায়?
একটি যৌক্তিক সংস্কার হতে পারে, অনাস্থা প্রস্তাব বা বাজেটের মতো সরকার টিকে থাকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ভোটে দলীয় শৃঙ্খলা বজায় থাকবে, কিন্তু সাধারণ আইন, নীতি, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বা অন্যান্য বিষয়ে সংসদ সদস্যরা বিবেক ও জনগণের স্বার্থ অনুযায়ী ভোট দিতে পারবেন।
বাংলাদেশে অনুচ্ছেদ ৭০ সংস্কার নিয়ে বর্তমানে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক আলোচনাও চলছে। ২১ আগস্ট ২০২৬-এ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, জুলাই সনদের আলোকে অনুচ্ছেদ ৭০ সংশোধনের কথা রয়েছে।
গণতন্ত্রের সঙ্গে জবাবদিহিতার সম্পর্ক
গণতন্ত্রের আসল শক্তি শুধু নির্বাচন নয়, জবাবদিহিতা।
মন্ত্রী জানবেন সংসদ তাকে প্রশ্ন করতে পারে।
সংসদ সদস্য জানবেন জনগণ তাকে প্রশ্ন করবে।
দলের নেতা জানবেন দলের সদস্যরা তার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন।
প্রশাসন জানবে আইন ও সংসদীয় কমিটি তার কাজ পরীক্ষা করবে।
এই শৃঙ্খল ভেঙে গেলে ক্ষমতা ক্রমে কেন্দ্রীভূত হয়।
আর ক্ষমতার ওপর কার্যকর নজরদারি না থাকলে ভুল নীতি, অপচয় ও দুর্নীতির ঝুঁকি বেড়ে যায়।
জবাবদিহিতা ছাড়া উন্নয়ন কেন টেকসই নয়
রাস্তা, সেতু ও বড় ভবন তৈরি করলেই উন্নয়ন সম্পূর্ণ হয় না।
ধরুন, একটি প্রকল্পের জন্য ১০০ টাকা বরাদ্দ হলো। কার্যকর জবাবদিহিতা না থাকায় যদি তার বড় অংশ অপচয় বা দুর্নীতিতে চলে যায়, তাহলে একই অর্থে যে উন্নয়ন হওয়ার কথা ছিল তা হবে না।
অন্যদিকে সংসদ, অডিট, আদালত, সংবাদমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ কার্যকরভাবে প্রশ্ন করতে পারলে সরকারের ওপর অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহারের চাপ বাড়ে।
সুতরাং আমার সূত্র হলো:
গণতন্ত্র → জবাবদিহিতা → সুশাসন → সম্পদের সঠিক ব্যবহার → টেকসই উন্নয়ন।
এই শৃঙ্খলের প্রথম দুটি দুর্বল হলে শেষের উন্নয়নও দীর্ঘস্থায়ী হওয়া কঠিন।
নিজের ঘর থেকেই গণতন্ত্র শুরু করতে হবে
একটি রাজনৈতিক দল যদি দেশের জন্য গণতন্ত্র দাবি করে, তাকে আগে নিজের সংগঠনের মধ্যেই গণতন্ত্রের উদাহরণ সৃষ্টি করতে হবে।
নিয়মিত ও প্রতিযোগিতামূলক নেতৃত্ব নির্বাচন থাকতে হবে।
যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রার্থী বাছাই করতে হবে।
ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার থাকতে হবে।
আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা থাকতে হবে।
নেতাকে প্রশ্ন করাকে অপরাধ হিসেবে দেখা যাবে না।
কারণ যে দল নিজের সদস্যের স্বাধীন মতামত সহ্য করতে পারে না, সে রাষ্ট্রক্ষমতায় গিয়ে নাগরিকের স্বাধীন মতামত কতটা সহ্য করবে, সেটাই বড় প্রশ্ন।
আমার দর্শন
আমি তাই বলি:
দলের ভেতরে গণতন্ত্র ছাড়া দেশে গণতন্ত্র হয় না।
স্বাধীন সংসদ ছাড়া কার্যকর গণতন্ত্র হয় না।
জবাবদিহিতা ছাড়া সুশাসন হয় না।
আর সুশাসন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন হয় না।
সংসদ সদস্যকে দলের দাস বানানো যাবে না, আবার অর্থের বিনিময়ে দলবদলের সুযোগও দেওয়া যাবে না। আমাদের এমন সাংবিধানিক ভারসাম্য তৈরি করতে হবে যেখানে সরকার থাকবে স্থিতিশীল, কিন্তু সংসদ থাকবে স্বাধীন।
আমার মতে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গণতন্ত্রের জন্য তিনটি সংস্কার অপরিহার্য:
দলের ভেতরে গণতন্ত্র, সংসদের কার্যকর স্বাধীনতা এবং সর্বস্তরে জবাবদিহিতা।
এগুলো প্রতিষ্ঠিত হলে সংসদ শুধু আইন পাস করার প্রতিষ্ঠান থাকবে না; এটি সত্যিকার অর্থে জনগণের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠবে।
Philosopher Deshbandhu Advocate A. N. M. Essa 























