ঢাকা ০৫:৩৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬, ৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রবাসীদের সব ধরনের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইন, ২০০২ সংশোধনের দাবি 

প্রবাসীদের সব ধরনের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইন, ২০০২ সংশোধনের দাবি করেছেন – অ্যাডভোকেট এ. এন. এম. ঈসা. প্রতিষ্ঠাতা ও আহ্বায়ক আন্তর্জাতিক রেমিট্যান্স যোদ্ধা সংসদ

 

প্রবাসীর জন্য আইনের বাইরে বিশেষ সুবিধা নয়, সময়োপযোগী ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা.

বাংলাদেশের প্রবাসী নাগরিকরা বছরের অধিকাংশ সময় বিদেশে কর্মরত থাকেন। তারা সাধারণত অল্প সময়ের ছুটি নিয়ে বাংলাদেশে আসেন এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই আবার কর্মস্থলে ফিরে যেতে হয়। তাদের বৈধ ভিসা, চাকরি, ব্যবসা, বিদেশে বসবাসের অনুমতি এবং আগাম কেনা ফিরতি বিমানের টিকিট থাকে।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় আন্তর্জাতিক রেমিট্যান্স যোদ্ধা সংসদের প্রতিষ্ঠাতা ও আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট এ. এন. এম. ঈসা প্রবাসীদের সংশ্লিষ্ট মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইন, ২০০২ সংশোধন করে বিশেষ আইনি ব্যবস্থা চালুর আবেদন জানিয়েছেন।

তবে আইনগতভাবে বিষয়টি পরিষ্কার করা প্রয়োজন। বর্তমান দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইন, ২০০২ মূলত সরকার কর্তৃক নির্ধারিত কিছু ফৌজদারি মামলার দ্রুত বিচার করার জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠনের ব্যবস্থা করেছে। এটি বর্তমানে শুধু কোনো ব্যক্তি প্রবাসী হওয়ার কারণে তার দেওয়ানি, পারিবারিক, সম্পত্তি বা সব ধরনের মামলা স্বয়ংক্রিয়ভাবে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর আইন নয়। তাই প্রবাসীদের জন্য এমন ব্যবস্থা করতে হলে সংসদের মাধ্যমে আইন সংশোধন বা নতুন আইনি কাঠামো তৈরি করতে হবে।

কেন এই আইন সংশোধনের প্রয়োজন

ধরা যাক, একজন বাংলাদেশি প্রবাসী যুক্তরাজ্যে কর্মরত। তিনি মাত্র এক মাসের ছুটিতে দেশে এসেছেন। দেশে এসে জানতে পারলেন তার জমি জবরদখল হয়েছে। তিনি মামলা করলেন। প্রথম শুনানি হলো, এরপর পরবর্তী তারিখ পড়ল তিন বা চার মাস পরে।

দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী কারও জন্য পরবর্তী তারিখে আদালতে উপস্থিত হওয়া তুলনামূলক সহজ হতে পারে। কিন্তু একজন প্রবাসীর জন্য একটি আদালতের তারিখ মানে আবার বিমানের টিকিট কেনা, বিদেশের কর্মস্থল থেকে ছুটি নেওয়া, কয়েক দিনের আয় হারানো এবং কখনো চাকরি হারানোর ঝুঁকি নেওয়া।

আবার ধরা যাক, একজন প্রবাসী দুই সপ্তাহের ছুটিতে বাংলাদেশে এসে পারিবারিক বিরোধের কারণে একটি ফৌজদারি মামলায় আসামি হলেন। তার বিদেশে কাজে যোগ দেওয়ার তারিখ দশ দিন পর। মামলার প্রাথমিক কার্যক্রমই যদি দীর্ঘ হয়, তাহলে অভিযোগের সত্য-মিথ্যা নির্ধারণের আগেই তার চাকরি ও জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এখানেই একজন প্রবাসীর মামলার সঙ্গে সাধারণ মামলার বাস্তব পার্থক্য।

সংবিধানের সঙ্গে দাবিটির সম্পর্ক

বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে সকল নাগরিককে আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকার দেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে সংবিধানের ৩৫(৩) অনুচ্ছেদে ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচারের অধিকার স্বীকৃত রয়েছে। তাই দ্রুত বিচার কোনো অস্বাভাবিক ধারণা নয়; ফৌজদারি বিচারের ক্ষেত্রে এর সরাসরি সাংবিধানিক ভিত্তি রয়েছে।

আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, প্রবাসীদের জন্য আলাদা ফলাফল বা আলাদা আইন নয়; বরং তাদের বাস্তব সময়সীমা বিবেচনা করে বিচারের প্রক্রিয়াকে দ্রুত করা।

“সব মামলা” বলতে কী বোঝানো উচিত

আইনগতভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।

হত্যা, মারামারি, প্রতারণা, চাঁদাবাজি বা অন্য ফৌজদারি অভিযোগ এক ধরনের মামলা। অন্যদিকে জমিজমা, দলিল বাতিল, সম্পত্তির মালিকানা, অর্থ আদায় বা অনেক পারিবারিক বিরোধ দেওয়ানি বা বিশেষ আইনের অধীনে পরিচালিত হয়।

তাই বর্তমান দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করলেও একই ট্রাইব্যুনালে সব দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা তুলে দেওয়া আইনগত ও প্রশাসনিকভাবে জটিল হতে পারে।

আরও বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা হতে পারে দুটি:

প্রথমত, প্রবাসীদের সংশ্লিষ্ট উপযুক্ত ফৌজদারি মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের আওতায় নেওয়ার জন্য ২০০২ সালের আইন সংশোধন।

দ্বিতীয়ত, দেওয়ানি, পারিবারিক, সম্পত্তি ও অন্যান্য মামলার জন্য পৃথক প্রবাসী দ্রুত বিচার বেঞ্চ বা ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত গঠন।

এতে বর্তমান বিচারব্যবস্থার কাঠামো নষ্ট না করেই একই উদ্দেশ্য অর্জন করা সম্ভব হতে পারে।

ফৌজদারি মামলায় বর্তমান আইনেও কিছু সুযোগ আছে

ফৌজদারি কার্যবিধির ২০৫ ধারায় ম্যাজিস্ট্রেট উপযুক্ত ক্ষেত্রে আসামির ব্যক্তিগত উপস্থিতি মওকুফ করে আইনজীবীর মাধ্যমে হাজিরার অনুমতি দিতে পারেন। এটি দেখায় যে বাংলাদেশের আইন ইতোমধ্যেই স্বীকার করে যে প্রত্যেক তারিখে ব্যক্তিগত উপস্থিতি সব ক্ষেত্রে অপরিহার্য নয়।

কিন্তু এটি সম্পূর্ণ সমস্যার সমাধান নয়। একজন প্রবাসীর মামলা যদি পাঁচ বা দশ বছর ধরে চলে, শুধু ব্যক্তিগত হাজিরা মওকুফ করলেই তার মামলা দ্রুত শেষ হবে না।

তাই প্রয়োজন মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি, শুধু হাজিরা থেকে অব্যাহতি নয়।

কীভাবে স্বয়ংক্রিয় অগ্রাধিকার ব্যবস্থা করা যেতে পারে

অ্যাডভোকেট এ. এন. এম. ঈসার প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য আইনে একটি বিশেষ সংজ্ঞা যোগ করা যেতে পারে, যেমন “প্রবাসী মামলাকারী”।

এই সুবিধা পাওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে পাসপোর্ট, বৈধ বিদেশি ভিসা বা আবাসিক অনুমতি, কর্মসংস্থানের প্রমাণ, বিদেশের ঠিকানা এবং প্রয়োজনে ফিরতি বিমানের টিকিট আদালতে জমা দিতে হতে পারে।

এসব যাচাই হওয়ার পর মামলাটি “প্রবাসী অগ্রাধিকার মামলা” হিসেবে তালিকাভুক্ত হতে পারে।

এর অর্থ এই নয় যে প্রবাসী হলেই মামলায় জিতবেন। কেবল বিচার দ্রুত হবে।

উদাহরণ এক: প্রবাসী আসামি

একজন কাতারপ্রবাসী তিন সপ্তাহের ছুটিতে দেশে এলেন। জমিজমা নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনায় তাকে একটি মামলায় আসামি করা হলো। তিনি দাবি করছেন অভিযোগটি মিথ্যা।

বর্তমান ব্যবস্থায় অভিযোগের নিষ্পত্তি দীর্ঘ হলে তার বিদেশে কাজে ফেরার ক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে।

প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় আদালত তার প্রবাসী পরিচয় যাচাই করে জামিন, অভিযোগ গঠন, প্রাথমিক সাক্ষ্য এবং অন্যান্য জরুরি ধাপ অগ্রাধিকারভিত্তিতে পরিচালনা করতে পারেন।

অপরাধ প্রমাণিত হলে অবশ্যই আইন অনুযায়ী শাস্তি হবে। কিন্তু শুধু মামলার দীর্ঘসূত্রতার কারণে তার জীবন অনির্দিষ্টকাল স্থগিত থাকবে না।

উদাহরণ দুই: প্রবাসী বাদী

একজন সৌদি আরবপ্রবাসী দেশে ফিরে দেখলেন তার জমি দখল করে নেওয়া হয়েছে।

তিনি মামলা করলেন। কিন্তু তাকে দুই সপ্তাহ পর সৌদি আরবে চাকরিতে ফিরতে হবে।

প্রবাসী ফাস্ট-ট্র্যাক ব্যবস্থায় জরুরি নিষেধাজ্ঞা, প্রাথমিক শুনানি ও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য দ্রুত গ্রহণ করা যেতে পারে। পরে যেখানে আইন অনুমতি দেয়, আইনজীবীর মাধ্যমে কার্যক্রম চালানো যেতে পারে।

উদাহরণ তিন: পারিবারিক মামলা

একজন নারী প্রবাসী বিদেশে বসবাস করেন। তিনি অল্প সময়ের জন্য বাংলাদেশে এসে পারিবারিক বা সম্পত্তিগত বিরোধের মামলা করেন।

প্রতিটি শুনানিতে তাকে বিদেশ থেকে বাংলাদেশে আসতে বাধ্য করলে ন্যায়বিচার পাওয়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়তে পারে।

এক্ষেত্রে পৃথক প্রবাসী ফাস্ট-ট্র্যাক পারিবারিক বেঞ্চ দ্রুত শুনানি করলে উভয় পক্ষই উপকৃত হতে পারে।

আইন সংশোধনে কী কী রাখা যেতে পারে

প্রস্তাবিত সংশোধনে বলা যেতে পারে যে, যাচাইকৃত প্রবাসী কোনো মামলার বাদী, বিবাদী, অভিযোগকারী বা আসামি হলে এবং তার বিদেশে কর্মসংস্থান বা বসবাসের কারণে মামলার বিলম্বে গুরুতর ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে আদালত মামলাটিকে অগ্রাধিকারভিত্তিতে গ্রহণ করবেন।

একই সঙ্গে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে শুনানি, অপ্রয়োজনীয় মুলতবি নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল নোটিশ, ভিডিও শুনানির সুযোগ এবং বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় দলিল দাখিলের ব্যবস্থাও রাখা যেতে পারে।

সমতার নীতি রক্ষা করতে হবে

প্রবাসীদের মামলা দ্রুত করার দাবি যেন অন্য পক্ষের অধিকার হরণ না করে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদের সমতার নীতির কারণে প্রবাসী পরিচয়কে এমন কোনো সুবিধায় পরিণত করা উচিত নয়, যার ফলে অন্য পক্ষ আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সময় বা সুযোগ হারান।

তাই আইনটি এমনভাবে তৈরি হতে হবে যাতে বিচারের গতি বাড়ে, কিন্তু ন্যায়বিচারের মান কমে না।

দ্রুত বিচার মানে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি নয়

অ্যাডভোকেট এ. এন. এম. ঈসা বলেন:

“আমরা বলছি না প্রবাসী হলে মামলা করা যাবে না। অপরাধ করলে প্রবাসীরও বিচার হবে। প্রবাসীর বিরুদ্ধে কেউ অপরাধ করলে তারও বিচার হবে। কিন্তু বিচার পেতে বা নিজের নির্দোষিতা প্রমাণ করতে একজন মানুষকে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে কেন?”

তিনি বলেন:

“একজন প্রবাসীর জীবনে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি হয়তো মাত্র ২০ দিনের জন্য দেশে এসেছেন। অথচ মামলার পরবর্তী তারিখ তিন মাস পরে। এই ব্যবস্থার পরিবর্তন দরকার।”

সরকারের প্রতি আবেদন

আন্তর্জাতিক রেমিট্যান্স যোদ্ধা সংসদের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সরকার, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট বিচারিক কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানানো হচ্ছে, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইন, ২০০২ পর্যালোচনা করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের উপযুক্ত ফৌজদারি মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির বিশেষ বিধান সংযোজন করা হোক।

একই সঙ্গে দেওয়ানি, পারিবারিক, জমিজমা ও অন্যান্য মামলার জন্য পৃথক প্রবাসী দ্রুত বিচার বেঞ্চ প্রতিষ্ঠার আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।

বাংলাদেশে বিশেষ পরিস্থিতির মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠনের আইন ইতোমধ্যেই রয়েছে। তাই প্রবাসীদের বাস্তব সমস্যাকে বিবেচনায় নিয়ে সেই কাঠামো সম্প্রসারণের বিষয়টি আইনসভা বিবেচনা করতে পারে।

আমার বক্তব্য:

“প্রবাসীর জন্য আলাদা ন্যায়বিচার চাই না, দ্রুত ন্যায়বিচার চাই।”

“প্রবাসী অপরাধ করলে বিচার হবে, প্রবাসীর বিরুদ্ধে অপরাধ হলেও বিচার হবে; কিন্তু কোনো মামলাই বছরের পর বছর ঝুলে থাকবে না।”

“দ্রুত বিচার মানে প্রবাসীকে সুবিধা দেওয়া নয়, সময়ের অপচয় বন্ধ করা।”

অ্যাডভোকেট এ. এন. এম. ঈসা
প্রতিষ্ঠাতা ও আহ্বায়ক
আন্তর্জাতিক রেমিট্যান্স যোদ্ধা সংসদ.

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

CrimeNews Media24

প্রবাসীদের সব ধরনের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইন, ২০০২ সংশোধনের দাবি 

আপডেট সময় ১০:৫০:০২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬

প্রবাসীদের সব ধরনের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইন, ২০০২ সংশোধনের দাবি করেছেন – অ্যাডভোকেট এ. এন. এম. ঈসা. প্রতিষ্ঠাতা ও আহ্বায়ক আন্তর্জাতিক রেমিট্যান্স যোদ্ধা সংসদ

 

প্রবাসীর জন্য আইনের বাইরে বিশেষ সুবিধা নয়, সময়োপযোগী ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা.

বাংলাদেশের প্রবাসী নাগরিকরা বছরের অধিকাংশ সময় বিদেশে কর্মরত থাকেন। তারা সাধারণত অল্প সময়ের ছুটি নিয়ে বাংলাদেশে আসেন এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই আবার কর্মস্থলে ফিরে যেতে হয়। তাদের বৈধ ভিসা, চাকরি, ব্যবসা, বিদেশে বসবাসের অনুমতি এবং আগাম কেনা ফিরতি বিমানের টিকিট থাকে।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় আন্তর্জাতিক রেমিট্যান্স যোদ্ধা সংসদের প্রতিষ্ঠাতা ও আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট এ. এন. এম. ঈসা প্রবাসীদের সংশ্লিষ্ট মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইন, ২০০২ সংশোধন করে বিশেষ আইনি ব্যবস্থা চালুর আবেদন জানিয়েছেন।

তবে আইনগতভাবে বিষয়টি পরিষ্কার করা প্রয়োজন। বর্তমান দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইন, ২০০২ মূলত সরকার কর্তৃক নির্ধারিত কিছু ফৌজদারি মামলার দ্রুত বিচার করার জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠনের ব্যবস্থা করেছে। এটি বর্তমানে শুধু কোনো ব্যক্তি প্রবাসী হওয়ার কারণে তার দেওয়ানি, পারিবারিক, সম্পত্তি বা সব ধরনের মামলা স্বয়ংক্রিয়ভাবে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর আইন নয়। তাই প্রবাসীদের জন্য এমন ব্যবস্থা করতে হলে সংসদের মাধ্যমে আইন সংশোধন বা নতুন আইনি কাঠামো তৈরি করতে হবে।

কেন এই আইন সংশোধনের প্রয়োজন

ধরা যাক, একজন বাংলাদেশি প্রবাসী যুক্তরাজ্যে কর্মরত। তিনি মাত্র এক মাসের ছুটিতে দেশে এসেছেন। দেশে এসে জানতে পারলেন তার জমি জবরদখল হয়েছে। তিনি মামলা করলেন। প্রথম শুনানি হলো, এরপর পরবর্তী তারিখ পড়ল তিন বা চার মাস পরে।

দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী কারও জন্য পরবর্তী তারিখে আদালতে উপস্থিত হওয়া তুলনামূলক সহজ হতে পারে। কিন্তু একজন প্রবাসীর জন্য একটি আদালতের তারিখ মানে আবার বিমানের টিকিট কেনা, বিদেশের কর্মস্থল থেকে ছুটি নেওয়া, কয়েক দিনের আয় হারানো এবং কখনো চাকরি হারানোর ঝুঁকি নেওয়া।

আবার ধরা যাক, একজন প্রবাসী দুই সপ্তাহের ছুটিতে বাংলাদেশে এসে পারিবারিক বিরোধের কারণে একটি ফৌজদারি মামলায় আসামি হলেন। তার বিদেশে কাজে যোগ দেওয়ার তারিখ দশ দিন পর। মামলার প্রাথমিক কার্যক্রমই যদি দীর্ঘ হয়, তাহলে অভিযোগের সত্য-মিথ্যা নির্ধারণের আগেই তার চাকরি ও জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এখানেই একজন প্রবাসীর মামলার সঙ্গে সাধারণ মামলার বাস্তব পার্থক্য।

সংবিধানের সঙ্গে দাবিটির সম্পর্ক

বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে সকল নাগরিককে আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকার দেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে সংবিধানের ৩৫(৩) অনুচ্ছেদে ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচারের অধিকার স্বীকৃত রয়েছে। তাই দ্রুত বিচার কোনো অস্বাভাবিক ধারণা নয়; ফৌজদারি বিচারের ক্ষেত্রে এর সরাসরি সাংবিধানিক ভিত্তি রয়েছে।

আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, প্রবাসীদের জন্য আলাদা ফলাফল বা আলাদা আইন নয়; বরং তাদের বাস্তব সময়সীমা বিবেচনা করে বিচারের প্রক্রিয়াকে দ্রুত করা।

“সব মামলা” বলতে কী বোঝানো উচিত

আইনগতভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।

হত্যা, মারামারি, প্রতারণা, চাঁদাবাজি বা অন্য ফৌজদারি অভিযোগ এক ধরনের মামলা। অন্যদিকে জমিজমা, দলিল বাতিল, সম্পত্তির মালিকানা, অর্থ আদায় বা অনেক পারিবারিক বিরোধ দেওয়ানি বা বিশেষ আইনের অধীনে পরিচালিত হয়।

তাই বর্তমান দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করলেও একই ট্রাইব্যুনালে সব দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা তুলে দেওয়া আইনগত ও প্রশাসনিকভাবে জটিল হতে পারে।

আরও বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা হতে পারে দুটি:

প্রথমত, প্রবাসীদের সংশ্লিষ্ট উপযুক্ত ফৌজদারি মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের আওতায় নেওয়ার জন্য ২০০২ সালের আইন সংশোধন।

দ্বিতীয়ত, দেওয়ানি, পারিবারিক, সম্পত্তি ও অন্যান্য মামলার জন্য পৃথক প্রবাসী দ্রুত বিচার বেঞ্চ বা ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত গঠন।

এতে বর্তমান বিচারব্যবস্থার কাঠামো নষ্ট না করেই একই উদ্দেশ্য অর্জন করা সম্ভব হতে পারে।

ফৌজদারি মামলায় বর্তমান আইনেও কিছু সুযোগ আছে

ফৌজদারি কার্যবিধির ২০৫ ধারায় ম্যাজিস্ট্রেট উপযুক্ত ক্ষেত্রে আসামির ব্যক্তিগত উপস্থিতি মওকুফ করে আইনজীবীর মাধ্যমে হাজিরার অনুমতি দিতে পারেন। এটি দেখায় যে বাংলাদেশের আইন ইতোমধ্যেই স্বীকার করে যে প্রত্যেক তারিখে ব্যক্তিগত উপস্থিতি সব ক্ষেত্রে অপরিহার্য নয়।

কিন্তু এটি সম্পূর্ণ সমস্যার সমাধান নয়। একজন প্রবাসীর মামলা যদি পাঁচ বা দশ বছর ধরে চলে, শুধু ব্যক্তিগত হাজিরা মওকুফ করলেই তার মামলা দ্রুত শেষ হবে না।

তাই প্রয়োজন মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি, শুধু হাজিরা থেকে অব্যাহতি নয়।

কীভাবে স্বয়ংক্রিয় অগ্রাধিকার ব্যবস্থা করা যেতে পারে

অ্যাডভোকেট এ. এন. এম. ঈসার প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য আইনে একটি বিশেষ সংজ্ঞা যোগ করা যেতে পারে, যেমন “প্রবাসী মামলাকারী”।

এই সুবিধা পাওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে পাসপোর্ট, বৈধ বিদেশি ভিসা বা আবাসিক অনুমতি, কর্মসংস্থানের প্রমাণ, বিদেশের ঠিকানা এবং প্রয়োজনে ফিরতি বিমানের টিকিট আদালতে জমা দিতে হতে পারে।

এসব যাচাই হওয়ার পর মামলাটি “প্রবাসী অগ্রাধিকার মামলা” হিসেবে তালিকাভুক্ত হতে পারে।

এর অর্থ এই নয় যে প্রবাসী হলেই মামলায় জিতবেন। কেবল বিচার দ্রুত হবে।

উদাহরণ এক: প্রবাসী আসামি

একজন কাতারপ্রবাসী তিন সপ্তাহের ছুটিতে দেশে এলেন। জমিজমা নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনায় তাকে একটি মামলায় আসামি করা হলো। তিনি দাবি করছেন অভিযোগটি মিথ্যা।

বর্তমান ব্যবস্থায় অভিযোগের নিষ্পত্তি দীর্ঘ হলে তার বিদেশে কাজে ফেরার ক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে।

প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় আদালত তার প্রবাসী পরিচয় যাচাই করে জামিন, অভিযোগ গঠন, প্রাথমিক সাক্ষ্য এবং অন্যান্য জরুরি ধাপ অগ্রাধিকারভিত্তিতে পরিচালনা করতে পারেন।

অপরাধ প্রমাণিত হলে অবশ্যই আইন অনুযায়ী শাস্তি হবে। কিন্তু শুধু মামলার দীর্ঘসূত্রতার কারণে তার জীবন অনির্দিষ্টকাল স্থগিত থাকবে না।

উদাহরণ দুই: প্রবাসী বাদী

একজন সৌদি আরবপ্রবাসী দেশে ফিরে দেখলেন তার জমি দখল করে নেওয়া হয়েছে।

তিনি মামলা করলেন। কিন্তু তাকে দুই সপ্তাহ পর সৌদি আরবে চাকরিতে ফিরতে হবে।

প্রবাসী ফাস্ট-ট্র্যাক ব্যবস্থায় জরুরি নিষেধাজ্ঞা, প্রাথমিক শুনানি ও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য দ্রুত গ্রহণ করা যেতে পারে। পরে যেখানে আইন অনুমতি দেয়, আইনজীবীর মাধ্যমে কার্যক্রম চালানো যেতে পারে।

উদাহরণ তিন: পারিবারিক মামলা

একজন নারী প্রবাসী বিদেশে বসবাস করেন। তিনি অল্প সময়ের জন্য বাংলাদেশে এসে পারিবারিক বা সম্পত্তিগত বিরোধের মামলা করেন।

প্রতিটি শুনানিতে তাকে বিদেশ থেকে বাংলাদেশে আসতে বাধ্য করলে ন্যায়বিচার পাওয়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়তে পারে।

এক্ষেত্রে পৃথক প্রবাসী ফাস্ট-ট্র্যাক পারিবারিক বেঞ্চ দ্রুত শুনানি করলে উভয় পক্ষই উপকৃত হতে পারে।

আইন সংশোধনে কী কী রাখা যেতে পারে

প্রস্তাবিত সংশোধনে বলা যেতে পারে যে, যাচাইকৃত প্রবাসী কোনো মামলার বাদী, বিবাদী, অভিযোগকারী বা আসামি হলে এবং তার বিদেশে কর্মসংস্থান বা বসবাসের কারণে মামলার বিলম্বে গুরুতর ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে আদালত মামলাটিকে অগ্রাধিকারভিত্তিতে গ্রহণ করবেন।

একই সঙ্গে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে শুনানি, অপ্রয়োজনীয় মুলতবি নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল নোটিশ, ভিডিও শুনানির সুযোগ এবং বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় দলিল দাখিলের ব্যবস্থাও রাখা যেতে পারে।

সমতার নীতি রক্ষা করতে হবে

প্রবাসীদের মামলা দ্রুত করার দাবি যেন অন্য পক্ষের অধিকার হরণ না করে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদের সমতার নীতির কারণে প্রবাসী পরিচয়কে এমন কোনো সুবিধায় পরিণত করা উচিত নয়, যার ফলে অন্য পক্ষ আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সময় বা সুযোগ হারান।

তাই আইনটি এমনভাবে তৈরি হতে হবে যাতে বিচারের গতি বাড়ে, কিন্তু ন্যায়বিচারের মান কমে না।

দ্রুত বিচার মানে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি নয়

অ্যাডভোকেট এ. এন. এম. ঈসা বলেন:

“আমরা বলছি না প্রবাসী হলে মামলা করা যাবে না। অপরাধ করলে প্রবাসীরও বিচার হবে। প্রবাসীর বিরুদ্ধে কেউ অপরাধ করলে তারও বিচার হবে। কিন্তু বিচার পেতে বা নিজের নির্দোষিতা প্রমাণ করতে একজন মানুষকে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে কেন?”

তিনি বলেন:

“একজন প্রবাসীর জীবনে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি হয়তো মাত্র ২০ দিনের জন্য দেশে এসেছেন। অথচ মামলার পরবর্তী তারিখ তিন মাস পরে। এই ব্যবস্থার পরিবর্তন দরকার।”

সরকারের প্রতি আবেদন

আন্তর্জাতিক রেমিট্যান্স যোদ্ধা সংসদের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সরকার, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট বিচারিক কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানানো হচ্ছে, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইন, ২০০২ পর্যালোচনা করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের উপযুক্ত ফৌজদারি মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির বিশেষ বিধান সংযোজন করা হোক।

একই সঙ্গে দেওয়ানি, পারিবারিক, জমিজমা ও অন্যান্য মামলার জন্য পৃথক প্রবাসী দ্রুত বিচার বেঞ্চ প্রতিষ্ঠার আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।

বাংলাদেশে বিশেষ পরিস্থিতির মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠনের আইন ইতোমধ্যেই রয়েছে। তাই প্রবাসীদের বাস্তব সমস্যাকে বিবেচনায় নিয়ে সেই কাঠামো সম্প্রসারণের বিষয়টি আইনসভা বিবেচনা করতে পারে।

আমার বক্তব্য:

“প্রবাসীর জন্য আলাদা ন্যায়বিচার চাই না, দ্রুত ন্যায়বিচার চাই।”

“প্রবাসী অপরাধ করলে বিচার হবে, প্রবাসীর বিরুদ্ধে অপরাধ হলেও বিচার হবে; কিন্তু কোনো মামলাই বছরের পর বছর ঝুলে থাকবে না।”

“দ্রুত বিচার মানে প্রবাসীকে সুবিধা দেওয়া নয়, সময়ের অপচয় বন্ধ করা।”

অ্যাডভোকেট এ. এন. এম. ঈসা
প্রতিষ্ঠাতা ও আহ্বায়ক
আন্তর্জাতিক রেমিট্যান্স যোদ্ধা সংসদ.