অবৈধভাবে দেশের অর্থ চলে যাচ্ছে বিদেশে, যাকে বলে অর্থ পাচার। বংলাদেশ থেকে প্রতিবছর যে হারে টাকা পাচার হচ্ছে তা দিয়ে কয়েকটি পদ্মা সেতু বানানো সম্ভব। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত ১৬ বছরে বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অর্থ পাচার হয়েছে অন্তত ১১ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০০৪ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর পাচার হয়েছে সর্বনিম্ন ২৮ হাজার কোটি এবং সর্বোচ্চ ৬১ হাজার কোটি টাকা করে। কিন্তু ২০১৩ সালে টাকা পাচারে রীতিমতো উল্লম্ফন ঘটে। এ বছর পাচার হয় ৮২ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এরপর থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর গড়ে ৭৪ হাজার কোটি টাকা করে পাচার হয়েছে বলে জানা গেছে।
বারবারই আলোচনায় আসছে দেশ থেকে অর্থ পাচারের বিষয়টি। প্রসঙ্গটি আবারও আলোচনায় এলো সোমবার। অর্থ পাচার মামলায় এনু-রুপন দুই ভাইকে ৭ বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত। ফলে এদিন আবারও সামনে আসে দেশের টাকা বিদেশে পাচারের বিষয়টি। কিন্তু কেন রোধ করা যাচ্ছে না অর্থ পাচার। এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা দিয়েছেন ভিন্ন ভিন্ন মত।
এ প্রসঙ্গে দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সোমবার বলেন, যারা অর্থ পাচার করছে তারা আর্থিক, রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিকভাবে অনেক প্রভাবশালী। এজন্য তাদের বিরুদ্ধে দুদক বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কখনই কঠোর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না। সুতরাং অর্থ পাচার রোধ করতে হলে সবার আগে রাজনৈতিক সদিচ্ছার দরকার। তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে আসলে প্রতিবছর কী পরিমাণ অর্থ পাচার হয় তার সঠিক কোনো তথ্য কখনই পাওয়া যায় না। কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা দেশের আর কোনো সংস্থা কখনই এ তথ্য প্রকাশ করে না। মাঝেমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জিএফআই টাকা পাচারের বাৎসরিক রিপোর্ট প্রকাশ করে। তখন বাংলাদেশ সম্পর্কেও কিছু তথ্য পাওয়া যায়, কিন্তু এখানে যেসব তথ্য দেওয়া হয় সেটি দেশ থেকে টাকা পাচারের প্রকৃত চিত্র নয়। প্রকৃতপক্ষে দেশ থেকে আরও বেশি পরিমাণে অর্থ পাচার হচ্ছে প্রতিবছর।’
জিএফআই প্রকাশিত তথ্য মতে, ২০০৪ সালে বাংলাদেশ থেকে ২৮ হাজার ৪৭৫ কোটি, ২০০৫ সালে ৩৬ হাজার ২১০ কোটি, ২০০৬ সালে ২৮ হাজার ৭৩০ কোটি, ২০০৭ সালে ৩৪ হাজার ৭৬৫ কোটি, ২০০৮ সালে ৫৪ হাজার ৭৪০ কোটি, ২০০৯ সালে ৫২ হাজার ১০৫ কোটি, ২০১০ সালে ৪৫ হাজার ৯৮৫ কোটি, ২০১১ সালে ৫০ হাজার ৩২০ কোটি, ২০১২ সালে ৬১ হাজার ৪৫৫ কোটি টাকা পাচার হয়।
জিএফআইয়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশ থেকে টাকা পাচারে বড় উল্লম্ফন হয় ২০১৩ সালে। এ বছর দেশ থেকে টাকা পাচার হয় ৮২ হাজার ১১০ কোটি। পরের বছর অর্থাৎ ২০১৪ সালে কিছুটা কমে হয় ৭৭ হাজার ৪৩৫ কোটি এবং ২০১৫ সালে আবারও বেড়ে ৯৮ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা পাচার হয়। অবশ্য ২০১৫ সালের পর বাংলাদেশ থেকে আর কোনো তথ্য না পাওয়ার কথা জানিয়ে সংস্থাটি বলেছিল, বিগত বছরগুলোতে অর্থ পাচারের ঘটনা অনেকাংশে বেড়েছে। আগের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ এবং অন্যান্য সংস্থার প্রতিবেদন আমলে নিয়ে সংস্থাটি জানিয়েছিল, বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে বছরে গড়ে ৭৪ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যায়। সে হিসাবে ২০১৬ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ৬ বছরে পাচার হয়েছে অন্তত ৪ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। সব মিলিয়ে গত ১৬ বছরে দেশ থেকে পাচার হয়েছে প্রায় ১১ লাখ কোটি টাকা।
রফতানির আড়ালেই পাচার হচ্ছে বেশি : বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর যে অর্থ পাচার হচ্ছে তার ৮০ শতাংশই যাচ্ছে আমদানি-রফতানির আড়ালে। বাংলাদেশ থেকে এসব অর্থ যাচ্ছে পৃথিবীর ৩৬টি দেশে। সবচেয়ে বেশি যাচ্ছে ১০টি দেশে। এর বড় অংশই জমা হচ্ছে সুইস ব্যাংকে। মূলত অর্থ পাচারের ঘটনায় পাঁচ কারণকে চিহ্নিত করেছেন অর্থনীতিবিদরা। এর মধ্যে বিনিয়োগের পরিবেশের অভাব, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার শঙ্কা, রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর দুর্বল নজরদারি, আইনের শাসনের ঘাটতি এবং বেপরোয়া দুর্নীতি। আমদানিতে মূল্য বেশি দেখানো বা ওভার ইনভয়েসিং, রফতানিতে মূল্য কম দেখানো বা আন্ডার ইনভয়েসিং আর হুন্ডি- টাকা পাচারের এই তিনটি জনপ্রিয় মাধ্যম। গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটিসহ বিভিন্ন সংস্থা বলছে, প্রায় ৮০ শতাংশ অর্থ পাচার হয় এসবের মাধ্যমে।
মূলত করছাড়, প্রশ্নবিহীন বিনিয়োগের অবাধ সুযোগের প্রলোভন দিয়ে উন্নয়নশীল দেশের টাকা নিজেদের অর্থনীতিতে নিতে আগ্রহী উন্নত দেশগুলো। অর্থ পাচারের খোঁজখবর রাখে এমন সব বৈশি^ক সংস্থার তথ্য-উপাত্ত বলছে, বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচার হয় বিশ্বের ৩৬টি দেশে। তবে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়ে যাওয়া টাকায় সবচেয়ে বেশি হৃষ্টপুষ্ট হয়েছে ১০ দেশের অর্থনীতি। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে সিঙ্গাপুর, কানাডা, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, অস্ট্রেলিয়া, হংকং এবং থাইল্যান্ড।
কী বলছেন অর্থনীতিবিদরা : অর্থ পাচারের বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. এবি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘অবৈধ আয়ের উৎস বন্ধ করতে না পারলে টাকা পাচার বন্ধ করা যাবে না। অর্থ পাচার প্রতিরোধে প্রথমেই দেখতে হবে এর সূত্রগুলো কী কী, কীভাবে দেশ থেকে অর্থ পাচার হচ্ছে? আমদানি-রফতানিতে ওভার ইনভয়েসিং (আমদানিতে বেশি মূল্য দেখানো) এবং আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের (রফতানিতে কম মূল্য দেখানো) মাধ্যমে মূলত অর্থ পাচার বেশি হয়ে থাকে। অর্থাৎ অধিকাংশ অর্থ পাচার হয় বাণিজ্যভিত্তিক। এক্ষেত্রে এনবিআরের কাস্টমস, বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), সিআইডিসহ সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থাগুলোর কাজ করা উচিত। ভবিষ্যতে যাতে অর্থ পাচার বন্ধ হয় সে ব্যবস্থাই আমাদের করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘অবৈধভাবে যারা অর্থ আয় করে, তা চোরাচালানের মাধ্যমে হোক কিংবা অন্য কোনো অবৈধ উপায়ে হোক, টাকা আয় করে দেশে রাখা নিরাপদ মনে করে না। বিদেশে পাঠিয়ে দেন। এসব টাকা কোথায়, কোন দেশে যাচ্ছে তা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতা নিয়ে বের করা দরকার। বের করতে পারলে ওই দেশের আইনি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। এটা যদি করা যায় তা হলে ভবিষ্যতে অর্থ পাচার বন্ধ হবে। তা না হলে চলতেই থাকবে। আর এভাবে টাকা বাইরে চলে গেলে দেশের অর্থনীতি ভঙ্গুর হয়ে পড়বে।’
আইনে যা বলা আছে : অর্থ পাচার রোধে দেশে প্রয়োজনীয় আইন রয়েছে। আইনে পাচারকারীর দ্বিগুণ জরিমানা, ৪ থেকে ১২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং সম্পদ বাজেয়াপ্তের বিধান আছে। কিন্তু আইন প্রয়োগের দৃষ্টান্ত নেই বললেই চলে। ফলে দেশ থেকে অর্থ পাচার ঠেকানো যাচ্ছে না। অর্থ পাচার রোধে বাংলাদেশে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন করা হয় ২০১২ সালে। সর্বশেষ ২০১৫ সালের ২৬ নভেম্বর এ আইন সংশোধন করা হয়। অর্থ সংক্রান্ত অপরাধ ঠেকাতে সরকার এ সংক্রান্ত আইন আধুনিকায়ন করেছে। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ নামে এটি পরিচিত। এই আইনের ৪(২) ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি মানি লন্ডারিং বা মানি লন্ডারিং অপরাধ সংঘটনের চেষ্টা, সহায়তা বা ষড়যন্ত্র করিলে তিনি অন্যূন ৪ (চার) বছর এবং অনধিক ১২ (বারো) বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির দ্বিগুণ মূল্যের সমপরিমাণ অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।’
আইনের ১৭(১) ধারায় বলা আছে, ‘এই আইনের অধীন কোনো ব্যক্তি বা সত্তা মানি লন্ডারিং অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হইলে আদালত অপরাধের সহিত প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত দেশে বা দেশের বাহিরে অবস্থিত যে কোনো সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করিবার আদেশ প্রদান করিতে পারিবে।’ কিন্তু আইনটির কার্যকর প্রয়োগের অভাবে পাচার বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মাত্র ২১ কোটি টাকা ফেরত আনা হয়েছে : এই অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগও মুখ থুবড়ে পড়েছে। তবে দুদক সূত্রে জানা গেছে, একটি ঘটনায় মাত্র ২১ কোটি টাকা ফেরত আনা সম্ভব হয়েছে। কারণ হিসেবে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ার কথা বলছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। অবশ্য জিএফআইয়ের তথ্য আস্থায় নিতে রাজি নন সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থ পাচারের প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ। বর্তমানে এমন অনেক খাতে অর্থ পাচার হচ্ছে, যা জিএফআই আমলে নেয় না।
মামলা হলেও নিষ্পত্তি হয় না : অর্থ পাচারে দুদক মামলা করে বিভিন্ন সময়, তবে অর্থ পাচারের ৯৫ শতাংশ মামলাই নিষ্পত্তি হয়নি। মোট মামলার তিন-চতুর্থাংশই পারেনি নিম্ন আদালতের গণ্ডি পেরোতে। সুপ্রিমকোর্ট ও দুদকের তথ্য বলছে, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলার সংখ্যা ৪০৮, যার মধ্যে ১৮৭টি মামলা দুদকের। ৮৫টি মামলার বিচার চলছে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে। আর ঢাকায় ১০টি বিশেষ জজ আদালতে বিচারাধীন ১৮৫টি মামলা। এর মধ্যে হাইকোর্টের আদেশে ৫২টি মামলার বিচারকাজ স্থগিত। আপিল শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে ২০টিরও কম মামলা। উচ্চ আদালতে মামলা নিষ্পত্তির সংখ্যাও ২০-এর বেশি নয়।
এ বিষয়ে কথা বলতে চাননি দুদকের আইনজীবী : অর্থ পাচারের বিষয়ে জানতে দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলমের সঙ্গে সোমবার যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি এখন কোনো কথা বলতে পারব না।’ অর্থ উদ্ধার ও মামলা প্রসঙ্গে জানতে চাইলেও তিনি কথা বলতে রাজি হননি।