ঢাকা ১০:০৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রওনক জাহানের জীবনের গল্প

  • Reporter Name
  • আপডেট সময় ০১:০১:১৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ১১ বার পড়া হয়েছে

১৯৪৪ সালে জন্ম নেওয়া রওনক জাহানের শৈশব কেটেছে কুমিল্লা, বাগেরহাট, ভোলা ও মুন্সিগঞ্জের মতো বিভিন্ন শহরে। পঞ্চাশের দশকে এসব জায়গায় পড়াশোনার সময়ই বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন তিনি।
পরিবার আর্থিকভাবে খুব স্বচ্ছল না হওয়ায় বিদেশে পড়াশোনার খরচ বহন করা সহজ ছিল না। তবে মেয়ের পড়াশোনার প্রতি তার বাবার ছিল গভীর উৎসাহ। রওনক জাহান বুঝেছিলেন, নিজের যোগ্যতায় বৃত্তি অর্জন করেই তাকে স্বপ্ন পূরণ করতে হবে। সেই লক্ষ্যেই পড়াশোনায় মনোযোগ দেন তিনি এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় বৃত্তি নিয়ে হার্ভার্ডে পড়ার সুযোগ পান।
ভোলার একটি বয়েজ স্কুলে পড়ার ইচ্ছা ছিল ছোট্ট রওনক জাহানের। বাবা তাকে স্কুলে ভর্তি করিয়েও দিয়েছিলেন। কিন্তু ছেলে-মেয়ের আলাদা শিক্ষাব্যবস্থার সেই সময়ের সামাজিক বাস্তবতায় ক্লাসরুমে বসার অনুমতি পাননি তিনি। নিয়মের ফাঁক গলে ভর্তি হলেও শুধু পরীক্ষার সময় আলাদা একটি কক্ষে বসে পরীক্ষা দিতে হতো তাকে।
শিক্ষার পথে এই বাধা অবশ্য দমিয়ে রাখতে পারেনি রওনক জাহানকে। বরং ছোটবেলাতেই তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন বিদেশে গিয়ে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার এবং বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি থেকে ডিগ্রি অর্জনের।
সেই স্বপ্নই একসময় তাকে নিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৭০ সালে হার্ভার্ড থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পিএইচডি অর্জন করেন তিনি।
নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, সম্ভবত তিনিই হার্ভার্ড থেকে পিএইচডি অর্জনকারী প্রথম বাঙালি নারী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেন রওনক জাহান। ১৯৬২ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে প্রথম শ্রেণিতে বিএ (সম্মান) এবং ১৯৬৩ সালে একই বিষয়ে প্রথম শ্রেণিতে এমএ সম্পন্ন করেন। ষাটের দশকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবনও তার চিন্তাজগতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
১৯৬৫ সালে রাষ্ট্রীয় বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান তিনি। হার্ভার্ডে গিয়ে নতুন ধরনের শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত হন। বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা করে আসায় ইংরেজিতে ক্লাস করা, নিজের মতামত প্রকাশ করা এবং আন্তর্জাতিক পরিসরের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। তার ওপর রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যাও ছিল খুব কম।
এই চ্যালেঞ্জই তাকে আরও দৃঢ় করে। ১৯৬৮ সালে হার্ভার্ড থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ সম্পন্ন করার পর শুরু করেন পিএইচডি গবেষণা। তার গবেষণার বিষয় ছিল পাকিস্তানের জাতীয় সংহতির সংকট।
পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক বৈষম্য নিয়ে স্বাধীনতার আগেই গবেষণা করেন তিনি। সেই গবেষণার ভিত্তিতে প্রকাশিত হয় তার আলোচিত বই ‘Pakistan: Failure in National Integration’। বইটি ১৯৭২ সালে প্রকাশিত হয়।
১৯৭০ সালে হার্ভার্ড থেকে পিএইচডি অর্জনের পরও থেমে থাকেননি রওনক জাহান। একই বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়ানোর পাশাপাশি তুলনামূলক রাজনীতি, রাজনৈতিক উন্নয়ন ও গবেষণাপদ্ধতি নিয়ে কাজ করেন। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন।
বাংলাদেশে নারী অধিকার ও নারী উন্নয়ন নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে তার। ১৯৭৩ সালে ‘Women for Women’ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। সংগঠনটি বাংলাদেশের নারী বিষয়ক গবেষণা ও অ্যাডভোকেসির প্রাথমিক প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি।
পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ও এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও নারী ও উন্নয়ন নিয়ে কাজ করেন তিনি।
হার্ভার্ডের সঙ্গেও তার সম্পর্ক পিএইচডির পর শেষ হয়নি। ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের Government Department-এ Teaching Fellow এবং ১৯৭১ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত Center for International Affairs ও Kennedy Institute-এ Research Associate হিসেবে কাজ করেন।
পরবর্তী সময়ে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গেও যুক্ত হন রওনক জাহান। বাংলাদেশের রাজনীতি, গণতন্ত্র, নারী ও উন্নয়ন নিয়ে তার গবেষণা আন্তর্জাতিক একাডেমিক পরিসরে পরিচিতি পায়।
রওনক জাহানের জীবনের গল্প তাই শুধু হার্ভার্ড থেকে পিএইচডি অর্জনের গল্প নয়। যে মেয়েটিকে একসময় ভোলার বয়েজ স্কুলে ভর্তি হয়েও ক্লাসরুমে বসতে দেওয়া হয়নি, সেই মেয়েই পরবর্তী সময়ে দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের জায়গা করে নেন।
বাবার উৎসাহ, নিজের মেধা ও বৃত্তির সুযোগ তার সামনে উচ্চশিক্ষার দরজা খুলে দিয়েছিল। আর সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে রওনক জাহান প্রমাণ করেছেন, সামাজিক বাধা কখনো কখনো পথ আটকে দিতে পারে, কিন্তু স্বপ্নকে থামিয়ে দিতে পারে না।

 

( সংগৃহীত)

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

CrimeNews Media24

রওনক জাহানের জীবনের গল্প

আপডেট সময় ০১:০১:১৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

১৯৪৪ সালে জন্ম নেওয়া রওনক জাহানের শৈশব কেটেছে কুমিল্লা, বাগেরহাট, ভোলা ও মুন্সিগঞ্জের মতো বিভিন্ন শহরে। পঞ্চাশের দশকে এসব জায়গায় পড়াশোনার সময়ই বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন তিনি।
পরিবার আর্থিকভাবে খুব স্বচ্ছল না হওয়ায় বিদেশে পড়াশোনার খরচ বহন করা সহজ ছিল না। তবে মেয়ের পড়াশোনার প্রতি তার বাবার ছিল গভীর উৎসাহ। রওনক জাহান বুঝেছিলেন, নিজের যোগ্যতায় বৃত্তি অর্জন করেই তাকে স্বপ্ন পূরণ করতে হবে। সেই লক্ষ্যেই পড়াশোনায় মনোযোগ দেন তিনি এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় বৃত্তি নিয়ে হার্ভার্ডে পড়ার সুযোগ পান।
ভোলার একটি বয়েজ স্কুলে পড়ার ইচ্ছা ছিল ছোট্ট রওনক জাহানের। বাবা তাকে স্কুলে ভর্তি করিয়েও দিয়েছিলেন। কিন্তু ছেলে-মেয়ের আলাদা শিক্ষাব্যবস্থার সেই সময়ের সামাজিক বাস্তবতায় ক্লাসরুমে বসার অনুমতি পাননি তিনি। নিয়মের ফাঁক গলে ভর্তি হলেও শুধু পরীক্ষার সময় আলাদা একটি কক্ষে বসে পরীক্ষা দিতে হতো তাকে।
শিক্ষার পথে এই বাধা অবশ্য দমিয়ে রাখতে পারেনি রওনক জাহানকে। বরং ছোটবেলাতেই তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন বিদেশে গিয়ে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার এবং বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি থেকে ডিগ্রি অর্জনের।
সেই স্বপ্নই একসময় তাকে নিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৭০ সালে হার্ভার্ড থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পিএইচডি অর্জন করেন তিনি।
নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, সম্ভবত তিনিই হার্ভার্ড থেকে পিএইচডি অর্জনকারী প্রথম বাঙালি নারী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেন রওনক জাহান। ১৯৬২ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে প্রথম শ্রেণিতে বিএ (সম্মান) এবং ১৯৬৩ সালে একই বিষয়ে প্রথম শ্রেণিতে এমএ সম্পন্ন করেন। ষাটের দশকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবনও তার চিন্তাজগতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
১৯৬৫ সালে রাষ্ট্রীয় বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান তিনি। হার্ভার্ডে গিয়ে নতুন ধরনের শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত হন। বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা করে আসায় ইংরেজিতে ক্লাস করা, নিজের মতামত প্রকাশ করা এবং আন্তর্জাতিক পরিসরের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। তার ওপর রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যাও ছিল খুব কম।
এই চ্যালেঞ্জই তাকে আরও দৃঢ় করে। ১৯৬৮ সালে হার্ভার্ড থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ সম্পন্ন করার পর শুরু করেন পিএইচডি গবেষণা। তার গবেষণার বিষয় ছিল পাকিস্তানের জাতীয় সংহতির সংকট।
পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক বৈষম্য নিয়ে স্বাধীনতার আগেই গবেষণা করেন তিনি। সেই গবেষণার ভিত্তিতে প্রকাশিত হয় তার আলোচিত বই ‘Pakistan: Failure in National Integration’। বইটি ১৯৭২ সালে প্রকাশিত হয়।
১৯৭০ সালে হার্ভার্ড থেকে পিএইচডি অর্জনের পরও থেমে থাকেননি রওনক জাহান। একই বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়ানোর পাশাপাশি তুলনামূলক রাজনীতি, রাজনৈতিক উন্নয়ন ও গবেষণাপদ্ধতি নিয়ে কাজ করেন। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন।
বাংলাদেশে নারী অধিকার ও নারী উন্নয়ন নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে তার। ১৯৭৩ সালে ‘Women for Women’ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। সংগঠনটি বাংলাদেশের নারী বিষয়ক গবেষণা ও অ্যাডভোকেসির প্রাথমিক প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি।
পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ও এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও নারী ও উন্নয়ন নিয়ে কাজ করেন তিনি।
হার্ভার্ডের সঙ্গেও তার সম্পর্ক পিএইচডির পর শেষ হয়নি। ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের Government Department-এ Teaching Fellow এবং ১৯৭১ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত Center for International Affairs ও Kennedy Institute-এ Research Associate হিসেবে কাজ করেন।
পরবর্তী সময়ে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গেও যুক্ত হন রওনক জাহান। বাংলাদেশের রাজনীতি, গণতন্ত্র, নারী ও উন্নয়ন নিয়ে তার গবেষণা আন্তর্জাতিক একাডেমিক পরিসরে পরিচিতি পায়।
রওনক জাহানের জীবনের গল্প তাই শুধু হার্ভার্ড থেকে পিএইচডি অর্জনের গল্প নয়। যে মেয়েটিকে একসময় ভোলার বয়েজ স্কুলে ভর্তি হয়েও ক্লাসরুমে বসতে দেওয়া হয়নি, সেই মেয়েই পরবর্তী সময়ে দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের জায়গা করে নেন।
বাবার উৎসাহ, নিজের মেধা ও বৃত্তির সুযোগ তার সামনে উচ্চশিক্ষার দরজা খুলে দিয়েছিল। আর সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে রওনক জাহান প্রমাণ করেছেন, সামাজিক বাধা কখনো কখনো পথ আটকে দিতে পারে, কিন্তু স্বপ্নকে থামিয়ে দিতে পারে না।

 

( সংগৃহীত)