জুমার দিনে মুসলমানদের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমল রয়েছে। হাদিসে এসব আমলের ফজিলতও বর্ণিত হয়েছে।
১. জুমার দিনের বিশেষ মর্যাদা আবু লুবাবা বিন আবদুল মুনজির (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) জুমার দিনের কয়েকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন। এ দিনেই আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে, পৃথিবীতে অবতরণ করানো হয়েছে এবং তাঁর মৃত্যু হয়েছে। জুমার দিনে এমন একটি সময় রয়েছে, যখন বান্দা আল্লাহর কাছে বৈধ কোনো দোয়া করলে তা কবুল হয়। এ দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে বলেও হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে। (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৮৯৫)
২. জুমার দিনের ফজরের নামাজে বিশেষ সুরা তিলাওয়াত জুমার দিন ফজরের নামাজে সুরা আস-সিজদা ও সুরা আল-ইনসান তিলাওয়াত করা সুন্নত। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) শুক্রবারের ফজরের নামাজে এ দুই সুরা পাঠ করতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১০৬৮)
এই সুরাগুলোতে আদম (আ.)-এর সৃষ্টি, পুনরুত্থান ও কিয়ামতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনা করা হয়েছে।
৩. জুমার দিন গোসল করা জুমার দিন গোসল করা এবং দ্রুত মসজিদে যাওয়া অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। আউস বিন আউস সাকাফি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি জুমার দিন উত্তমভাবে গোসল করে দ্রুত মসজিদে যায় এবং ইমামের কাছাকাছি বসে মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনে, তার প্রতিটি পদক্ষেপের বিনিময়ে এক বছরের রোজা ও নামাজের সওয়াব রয়েছে। (আবু দাউদ, হাদিস: ৩৪৫)
৪. সুগন্ধি ব্যবহার করা জুমার দিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি সুগন্ধি ব্যবহার করাও উত্তম আমল। আবু সাইদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) জুমার দিন সুগন্ধি পাওয়া গেলে তা ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৮০)।
৫. মসজিদে আগে পৌঁছানো জুমার দিন যত দ্রুত সম্ভব মসজিদে পৌঁছানো এবং ইমামের কাছাকাছি বসার বিশেষ ফজিলত রয়েছে। হাদিসে মসজিদে আগমনকারীদের সময়ের ভিত্তিতে বিভিন্ন কোরবানির সওয়াবের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। ইমাম খুতবার জন্য বসার পর ফেরেশতারা খুতবা শোনার জন্য উপস্থিত হন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৪১)
৬. খুতবার সময় নীরব থাকা ইমাম যখন জুমার খুতবা দেন, তখন সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনা উচিত। এ সময় কথা বলা বা অন্যকে কথা বলতে বলা থেকেও বিরত থাকতে হবে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন, খুতবার সময় কাউকে ‘চুপ থাকো’ বললেও অনর্থক কাজ করা হয়। (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ১৪০১)
৭. খুতবা শোনা ও জুমার নামাজ আদায় করা জুমার দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো জামাতের সঙ্গে জুমার নামাজ আদায় করা এবং মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনা। সালমান ফারসি (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি গোসল করে পবিত্রতা অর্জন করে, সুগন্ধি ব্যবহার করে মসজিদে যায়, মুসল্লিদের কষ্ট না দিয়ে নামাজ আদায় করে এবং ইমামের খুতবার সময় নীরব থাকে, তার দুই জুমার মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহ ক্ষমা করা হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৮৩)।
আরেক হাদিসে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা এবং এক রমজান থেকে পরবর্তী রমজান পর্যন্ত সময়ের গুনাহ মোচনের কথা বলা হয়েছে, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বিরত থাকা হয়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৩৩)
৮. জুমার নামাজে নির্ধারিত সুরা পাঠ নুমান ইবনে বশির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) জুমার নামাজ ও দুই ঈদের নামাজে ‘সাব্বিহিসমা রব্বিকাল আলা’ এবং ‘হাল আতা-কা হাদিসুল গাশিয়াহ’ সুরা পাঠ করতেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯১৩)
কিছু বর্ণনায় জুমার নামাজে সুরা জুমুআ ও সুরা আলা পাঠের কথাও এসেছে।
৯. দোয়া কবুলের বিশেষ সময় জুমার দিনে দোয়া কবুলের একটি বিশেষ সময় রয়েছে। হাদিসে মুসলমানদের এ সময় অনুসন্ধান করতে উৎসাহিত করা হয়েছে। জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) জুমার দিনে দোয়া কবুলের সময়টি আসরের পর অনুসন্ধান করতে বলেছেন। (আবু দাউদ, হাদিস: ১০৪৮)
তাই জুমার দিনে বিশেষ করে আসরের পর বেশি বেশি দোয়া, ইস্তিগফার ও আল্লাহর জিকির করা গুরুত্বপূর্ণ।
১০. সুরা কাহাফ পাঠ জুমার দিনের অন্যতম পরিচিত আমল হলো সুরা কাহাফ পাঠ করা। আবু সাইদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহাফ পাঠ করবে, দুই জুমার মধ্যবর্তী সময় তার জন্য আলোয় উদ্ভাসিত থাকবে। (সহিহ তারগিব, হাদিস: ১৪৭৩; আল-মুসতাদরাক: ২/৩৯৯)
সুরা কাহাফের শেষ ১০ আয়াত পাঠেরও বিশেষ ফজিলত হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।
১১. গুনাহ মাফের আমল জুমার দিন গোসল, পরিচ্ছন্নতা, সুগন্ধি ব্যবহার, মসজিদে দ্রুত পৌঁছানো, মুসল্লিদের কষ্ট না দেওয়া, নামাজ আদায় এবং খুতবার সময় নীরব থাকার মতো আমলগুলোর বিশেষ ফজিলত রয়েছে। এসব আমলের মাধ্যমে এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমার মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহ মাফ হওয়ার কথা সহিহ হাদিসে এসেছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৮৩)
১২. বেশি বেশি দরুদ পাঠ জুমার দিনে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা গুরুত্বপূর্ণ আমল। আউস বিন আবি আউস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জুমার দিন সর্বোত্তম দিনগুলোর একটি এবং এ দিনে তাঁর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করতে। কারণ জুমার দিনে উম্মতের দরুদ তাঁর কাছে পেশ করা হয়। (আবু দাউদ, হাদিস: ১০৪৭)
জুমার দিন মুসলমানদের জন্য সাপ্তাহিক ইবাদতের একটি বিশেষ সুযোগ। তাই গোসল করে পরিচ্ছন্ন হওয়া, সুগন্ধি ব্যবহার, দ্রুত মসজিদে যাওয়া, খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা, জুমার নামাজ আদায়, সুরা কাহাফ পাঠ, বেশি বেশি দরুদ ও দোয়া করার মাধ্যমে দিনটি কাটানো উচিত। এসব আমল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পাশাপাশি জুমার দিনের মর্যাদা উপলব্ধি করতে সহায়তা করে।
সংগৃহীত
Reporter Name 























