ঢাকা ০৫:৫৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬, ১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলা পপ গানের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল ও বিদ্রোহী নাম আজম খান

  • Reporter Name
  • আপডেট সময় ০১:১৭:২৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২৬৬ বার পড়া হয়েছে

মোঃ শহিদুল ইসলামঃ
বাংলা পপ গানের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল ও বিদ্রোহী নাম আজম খান। তাকে বলা হয় বাংলা পপ গানের সম্রাট। কারণ, তার কণ্ঠ, ব্যক্তিত্ব ও সাহসী সুরধারা একটি প্রজন্মের চেতনাকে নাড়া দিয়েছিল। সত্তরের দশকে যখন দেশের সংগীতধারা মূলত আধুনিক ও লোকগানের আবহে সীমাবদ্ধ, তখন আজম খান পশ্চিমা রক ও পপের প্রভাব নিয়ে তৈরি করেন এক নতুন ঢং, যা তরুণদের মনে জাগিয়ে তোলে স্বাধীনতা, প্রতিবাদ ও ভালোবাসার স্পন্দন।
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জাগরণে তার গান ছিল এক নতুন ভাষা। ‘রেললাইনের ওই বস্তিতে’ কিংবা ‘আলাল ও দুলাল’-এর মতো গানগুলো কেবল সুর নয়, সময়ের গল্পও বলে। সহজ-সরল শব্দ, তীব্র আবেগ আর প্রাণময় পরিবেশনা তাকে এনে দেয় অনন্য জনপ্রিয়তা। প্রয়াত গুণী এই শিল্পীর আজ জন্মদিন। বাংলা গানের এই কিংবদন্তির জন্ম ১৯৫০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। মরণব্যাধি ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে ২০১১ সালের ৫ জুন তিনি দেশবাসীকে কাঁদিয়ে পরপারে চলে যান।
আজম খান ১৯৫০ সালে ঢাকার আজিমপুরে জন্ম গ্রহণ করেন। বাবা সরকারি কর্মকর্তা হওয়ার সুবাদে তার ছেলেবেলা কাটে আজিমপুরের ১০ নম্বর সরকারি কোয়ার্টারে। ১৯৫৫ সালে তিনি প্রথমে আজিমপুরের ঢাকেশ্বরী স্কুলে শিশু শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৫৬ সালে তার বাবা কমলাপুরে বাড়ি বানান। এরপর থেকে সেখানে বসতি তাদের। সেখানে তিনি কমলাপুরের প্রভেনশিয়াল স্কুলে প্রাথমিক স্তরে এসে ভর্তি হন। তারপর ১৯৬৫ সালে সিদ্ধেশ্বরী হাইস্কুলে বাণিজ্য বিভাগে ভর্তি হন। এই স্কুল থেকে ১৯৬৮ সালে এসএসসি পাস করেন। ১৯৭০ সালে টিঅ্যান্ডটি কলেজ থেকে বাণিজ্য বিভাগে দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। মুক্তিযুদ্ধের পর পড়ালেখায় আর অগ্রসর হতে পারেননি।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি দেশ স্বাধীন করতে যুদ্ধেও যোগ দেন। মা-বাবার আশ্বাস নিয়ে দুই বন্ধুর সঙ্গে ভারতে ট্রেনিংয়ের উদ্দেশে রওনা হন। ক্যাম্পে গানও চলত, গান হয়ে ওঠে প্রেরণার হাতিয়ার। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ফের ঢাকায় ফিরে তিনি গান চর্চা শুরু করেন। বিদেশি ব্যান্ড এবং বিটলস, রোলিং স্টোনস শোনার প্রভাব তার নতুন ধারার গানকে সমৃদ্ধ করেছে।
আজম খানের কর্মজীবনের শুরু প্রকৃতপক্ষে ষাটের দশকের শুরুতে। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের পর ১৯৭২ সালে তিনি তার বন্ধুদের নিয়ে ‘উচ্চারণ ব্যান্ড’ গঠন করেন। তার ব্যান্ড উচ্চারণ এবং আখন্দ (লাকী আখন্দ ও হ্যাপী আখন্দ) ভ্রাতৃদ্বয় দেশব্যাপী সংগীতের জগতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। বন্ধু নিলু আর মনসুরকে গিটারে, সাদেক ড্রামে আর নিজেকে প্রধান ভোকালিস্ট করে অনুষ্ঠান করেছেন। ১৯৭২ সালে বিটিভিতে সেই অনুষ্ঠানের ‘এত সুন্দর দুনিয়ায় কিছুই রবে না রে’ ও ‘চার কালেমা সাক্ষী দেবে’ গান দুটি সরাসরি প্রচারিত হলে ব্যাপক প্রশংসা আর তুমুল জনপ্রিয়তা পান এই গানের দল।
তার গানে ছিল সচেতনতা, দেশপ্রেম, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়, তরুণদের উদ্বুদ্ধকরণ। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও চলতে থাকে তার গান। সে সময় তিনি গেয়েছিলেন ‘রেললাইনের ওই বস্তিতে’, ‘হাইকোর্টের মাজারে’, ‘এত সুন্দর দুনিয়ায়’, ‘অভিমানী’, ‘অনামিকা’, ‘পাপড়ি’, ‘আলাল ও দুলাল’, ‘আসি আসি বলে তুমি আর এলে না’, ‘আমি যারে চাইরে’, ‘জ্বালা জ্বালা’, ‘ও চাঁদ সুন্দর’, ‘ও রে সালেকা ও রে মালেকা’, ‘জীবনে কিছু পাব না রে’, ‘বাধা দিয়ো না’সহ অনেক জনপ্রিয় গান।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

CrimeNews Media24

জনপ্রিয় সংবাদ

বাংলা পপ গানের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল ও বিদ্রোহী নাম আজম খান

আপডেট সময় ০১:১৭:২৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

মোঃ শহিদুল ইসলামঃ
বাংলা পপ গানের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল ও বিদ্রোহী নাম আজম খান। তাকে বলা হয় বাংলা পপ গানের সম্রাট। কারণ, তার কণ্ঠ, ব্যক্তিত্ব ও সাহসী সুরধারা একটি প্রজন্মের চেতনাকে নাড়া দিয়েছিল। সত্তরের দশকে যখন দেশের সংগীতধারা মূলত আধুনিক ও লোকগানের আবহে সীমাবদ্ধ, তখন আজম খান পশ্চিমা রক ও পপের প্রভাব নিয়ে তৈরি করেন এক নতুন ঢং, যা তরুণদের মনে জাগিয়ে তোলে স্বাধীনতা, প্রতিবাদ ও ভালোবাসার স্পন্দন।
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জাগরণে তার গান ছিল এক নতুন ভাষা। ‘রেললাইনের ওই বস্তিতে’ কিংবা ‘আলাল ও দুলাল’-এর মতো গানগুলো কেবল সুর নয়, সময়ের গল্পও বলে। সহজ-সরল শব্দ, তীব্র আবেগ আর প্রাণময় পরিবেশনা তাকে এনে দেয় অনন্য জনপ্রিয়তা। প্রয়াত গুণী এই শিল্পীর আজ জন্মদিন। বাংলা গানের এই কিংবদন্তির জন্ম ১৯৫০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। মরণব্যাধি ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে ২০১১ সালের ৫ জুন তিনি দেশবাসীকে কাঁদিয়ে পরপারে চলে যান।
আজম খান ১৯৫০ সালে ঢাকার আজিমপুরে জন্ম গ্রহণ করেন। বাবা সরকারি কর্মকর্তা হওয়ার সুবাদে তার ছেলেবেলা কাটে আজিমপুরের ১০ নম্বর সরকারি কোয়ার্টারে। ১৯৫৫ সালে তিনি প্রথমে আজিমপুরের ঢাকেশ্বরী স্কুলে শিশু শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৫৬ সালে তার বাবা কমলাপুরে বাড়ি বানান। এরপর থেকে সেখানে বসতি তাদের। সেখানে তিনি কমলাপুরের প্রভেনশিয়াল স্কুলে প্রাথমিক স্তরে এসে ভর্তি হন। তারপর ১৯৬৫ সালে সিদ্ধেশ্বরী হাইস্কুলে বাণিজ্য বিভাগে ভর্তি হন। এই স্কুল থেকে ১৯৬৮ সালে এসএসসি পাস করেন। ১৯৭০ সালে টিঅ্যান্ডটি কলেজ থেকে বাণিজ্য বিভাগে দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। মুক্তিযুদ্ধের পর পড়ালেখায় আর অগ্রসর হতে পারেননি।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি দেশ স্বাধীন করতে যুদ্ধেও যোগ দেন। মা-বাবার আশ্বাস নিয়ে দুই বন্ধুর সঙ্গে ভারতে ট্রেনিংয়ের উদ্দেশে রওনা হন। ক্যাম্পে গানও চলত, গান হয়ে ওঠে প্রেরণার হাতিয়ার। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ফের ঢাকায় ফিরে তিনি গান চর্চা শুরু করেন। বিদেশি ব্যান্ড এবং বিটলস, রোলিং স্টোনস শোনার প্রভাব তার নতুন ধারার গানকে সমৃদ্ধ করেছে।
আজম খানের কর্মজীবনের শুরু প্রকৃতপক্ষে ষাটের দশকের শুরুতে। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের পর ১৯৭২ সালে তিনি তার বন্ধুদের নিয়ে ‘উচ্চারণ ব্যান্ড’ গঠন করেন। তার ব্যান্ড উচ্চারণ এবং আখন্দ (লাকী আখন্দ ও হ্যাপী আখন্দ) ভ্রাতৃদ্বয় দেশব্যাপী সংগীতের জগতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। বন্ধু নিলু আর মনসুরকে গিটারে, সাদেক ড্রামে আর নিজেকে প্রধান ভোকালিস্ট করে অনুষ্ঠান করেছেন। ১৯৭২ সালে বিটিভিতে সেই অনুষ্ঠানের ‘এত সুন্দর দুনিয়ায় কিছুই রবে না রে’ ও ‘চার কালেমা সাক্ষী দেবে’ গান দুটি সরাসরি প্রচারিত হলে ব্যাপক প্রশংসা আর তুমুল জনপ্রিয়তা পান এই গানের দল।
তার গানে ছিল সচেতনতা, দেশপ্রেম, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়, তরুণদের উদ্বুদ্ধকরণ। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও চলতে থাকে তার গান। সে সময় তিনি গেয়েছিলেন ‘রেললাইনের ওই বস্তিতে’, ‘হাইকোর্টের মাজারে’, ‘এত সুন্দর দুনিয়ায়’, ‘অভিমানী’, ‘অনামিকা’, ‘পাপড়ি’, ‘আলাল ও দুলাল’, ‘আসি আসি বলে তুমি আর এলে না’, ‘আমি যারে চাইরে’, ‘জ্বালা জ্বালা’, ‘ও চাঁদ সুন্দর’, ‘ও রে সালেকা ও রে মালেকা’, ‘জীবনে কিছু পাব না রে’, ‘বাধা দিয়ো না’সহ অনেক জনপ্রিয় গান।