নিজের শক্তি জানান দিতে মেহেদী হাসান বাপ্পী ও মোয়াজ্জেম হোসেন সজীব ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের ডেকে এনে সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটায়। আর ইমন সংঘর্ষের সময় নাহিদকে রড দিয়ে এলোপাতাড়িভাবে পিটিয়ে আহত করে। ইমন লম্বা ছুরি দিয়েও তাকে এলোপাতাড়ি কোপায়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় নাহিদ মারা যান। উসকানি ও গুজবে সাড়া দিয়ে সিয়াম সংঘর্ষে জড়ান। সিয়াম হলে থাকতেন না। তিনি ঢাকা কলেজের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। বাইরে থেকে এসে কলেজ শিক্ষার্থীদের পক্ষে সংঘর্ষে জড়ান সিয়াম।
একটি সূত্র জানায়, নাহিদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অন্যতম অভিযুক্ত ইমন সাতক্ষীরায় দুর্গম চরে আত্মগোপনে রয়েছে।
রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় আলোচিত ব্যবসায়ী-শিক্ষার্থী সংঘর্ষ এবং দুজন নিহত হওয়ার ঘটনায় জড়িত মাহমুদুল হাসান সিয়াম এবং সংঘর্ষের সূত্রপাতকারী মোয়াজ্জেম হোসেন সজীব ও মেহেদী হাসান বাপ্পীসহ তিনজনকে শরীয়তপুর ও কক্সবাজার থেকে গ্রেফতার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ, মিডিয়ায় প্রকাশিত ভিডিও ও ছবি দেখে নাহিদ হত্যায় দুজনকে শনাক্ত করেছে র্যাব। তাদের মধ্যে একজন গ্রেফতার সিয়াম। পলাতক ইমনকে এখনও গ্রেফতার করা যায়নি।
র্যাবের দাবি, বাপ্পী ও সজীব চুল ছোট করে কক্সবাজারে আত্মগোপন করে। সেখানে একটি আবাসিক হোটেলে চাকরি নেওয়ার চেষ্টা করছিল। আর সিয়াম শরীয়তপুরে দুর্গম এলাকায় আত্মগোপন করেছিল।
বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে কারওয়ান বাজার মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে র্যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, গত ১৮ এপ্রিল রাত থেকে ১৯ এপ্রিল ভোর পর্যন্ত নিউমার্কেট এলাকায় ব্যবসায়ী ও ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ চলে। সেহরির সময় সংঘর্ষ কিছুটা থামলেও সকাল সাড়ে ৯টার দিকে পুনরায় সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষে ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং বেশ কিছু ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়। প্রায় ১৮ ঘণ্টার এই সংঘর্ষে দুইজন নিহত এবং গণমাধ্যমকর্মী ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসহ সংঘর্ষে লিপ্ত উভয়পক্ষের দুই শতাধিক ব্যক্তি আহত হন।
এ ছাড়া রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সসহ বেশ কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর এবং কয়েকটি মোটরসাইকেলে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। চাঞ্চল্যকর ঘটনায় নিউমার্কেট থানায় দুটি হত্যা মামলা ও পুলিশের কাজে বাধা দেওয়াসহ গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় মোট পাঁচটি মামলা দায়ের করা হয়।
খন্দকার আল মঈন বলেন, মূলত গত ১৮ এপ্রিল নিউমার্কেটে পাশাপাশি দুটি ফাস্টফুডের দোকানের কর্মচারীদের মধ্যে ইফতার বিক্রয়ের টেবিল বসানো নিয়ে বাকবিতণ্ডা ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এতে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে এবং নিজেদের শক্তি জানান দিতে দোকানের কর্মচারী সজীব ও বাপ্পী ফোন করে কয়েকজন ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীকে আসতে বলে। কয়েকজন শিক্ষার্থী সেখানে পৌঁছলে পুনরায় ওই দুই দোকানের কর্মচারীদের মধ্যে মারামারি হয়।
র্যাবের মুখপাত্র বলেন, ওই মারামারিকে কেন্দ্র করে একটি স্বার্থান্বেষী মহল কৌশলে গুজব ছড়িয়ে ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহের চেষ্টা করে। এতে নিউমার্কেট এলাকায় ছাত্র ও ব্যবসায়ী-কর্মচারীদের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।
র্যাবের দাবি, ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে একটি স্বার্থান্বেষী মহল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বিবিধ তথ্য ও কন্টেন্ট ছড়িয়ে ইন্ধন দেওয়ায় উত্তেজনা চরম সহিংসতায় রূপ নেয়। সংঘর্ষে নাহিদ (১৮) নামে একজন কুরিয়ার সার্ভিস কর্মী ও মোরসালিন (২৬) নামে একজন গুরুতর আহত হন। পরবর্তী সময়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তারা মারা যান। বিষয়টি দেশব্যাপী ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে, যে কারণে র্যাব গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করে।
কমান্ডার আল মঈন বলেন, বুধবার রাতে র্যাব সদর দফতরের গোয়েন্দা শাখা, র্যাব-২ ও র্যাব-৩-এর যৌথ অভিযানে শরীয়তপুর ও কক্সবাজার থেকে সংঘর্ষের সূত্রপাতকারী মো. মোয়াজ্জেম হোসেন সজীব (২৩), মেহেদী হাসান বাপ্পী (২১) ও কুরিয়ার সার্ভিস কর্মী নাহিদ হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারী মো. মাহমুদুল হাসান সিয়ামকে (২১) গ্রেফতার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতাররা সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতার বিষয় স্বীকার করেছে। গ্রেফতার বাপ্পী ও সজীব নিউমার্কেটের ওয়েলকাম ফাস্টফুডের কর্মচারী ছিল। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানায়, রাজধানীর নিউমার্কেটের ক্যাপিটাল ফাস্টফুড এবং ওয়েলকাম ফাস্টফুডের কর্মচারীদের মধ্যে গত ১৮ এপ্রিল ইফতার বিক্রির টেবিল বসানো নিয়ে বাকবিতণ্ডার সূত্রপাত হয়। পরবর্তী সময়ে তারা পরিচিত কিছু দুষ্কৃতকারীকে মোবাইল ফোন দিয়ে ডেকে আনে। রাত সাড়ে ১১টার দিকে ১০-১৫ জন দুষ্কৃতকারী এসে ক্যাপিটাল ফাস্টফুডের কর্মচারীদের মারধর করে। এ সময় অন্যান্য দোকানের কর্মচারীরা আক্রমণ প্রতিহতের চেষ্টা চালায়। দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে উভয়পক্ষের কয়েকজন আহত হয়। পরবর্তী সময়ে ব্যাপক আকারে সংঘর্ষ হয়। ঘটনার পর বাপ্পী ও সজীব কক্সবাজারে আত্মগোপন করে এবং নিজের পরিচয় লোকানোর জন্য তার লম্বা চুল কেটে ছোট করে এবং কক্সবাজারের আবাসিক হোটেলে চাকরির চেষ্টা চালায়।
সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, গ্রেফতার মো. মাহমুদুল হাসান সিয়াম সংঘর্ষের এক পর্যায়ে নাহিদকে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে। গুরুতর আহত অবস্থায় নাহিদকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরবর্তী সময়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নাহিদ মারা যান। ঘটনার পর গ্রেফতার সিয়াম গ্রেফতার এড়াতে আত্মগোপনে চলে যায়। গ্রেফতার আসামিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।
এক প্রশ্নের জবাবে আল মঈন বলেন, সিয়াম একটি রড দিয়ে পিটিয়ে নাহিদকে ফেলে দেয়। সিয়াম সেখান থেকে সরে আসার পর ইমন গরু জবাই করা লম্বা ছুরি দিয়ে কুপিয়েছে বলে সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে। ইমনকে আমরা খুঁজছি, পুলিশও খুঁজছে। ইমন কোথাও আত্মগোপন করে আছে হয়তো।
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গ্রেফতারদের এখন পর্যন্ত কারও রাজনৈতিক পরিচয় পাওয়া যায়নি।
গণমাধ্যম কর্মীদের ওপর যারা আঘাত করেছে তাদের শনাক্তের কাজ চলছে। অনেককে শনাক্ত করা হয়েছে। তারা বহিরাগত ছিল সেখানে। তারাই মূলত গণমাধ্যম কর্মীদের ওপর আঘাত করেছে। শিগগিরই তাদেরও গ্রেফতারের জন্য অভিযান চালানো হবে।