ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিউমার্কেটের ব্যবসায়ীদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনায় লিপ্ত থাকা হেলমেটধারীদের কাউকে এখনও গ্রেফতার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে তাদের গ্রেফতারে একাধিক টিম অভিযান পরিচালনা করছে জানিয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (দক্ষিণ) মাহবুব আলম জানিয়েছেন, হেলমেট পরে সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া সবাই সন্ত্রাসী। তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে। গতকাল বুধবার দুপুরে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান তিনি। অন্যদিকে নিউমার্কেট থানার ওসি স ম কাইয়ুম বিএনপির এক মৃত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলার বিষয়ে বলেন, পৃথিবীতে এক নামে মানুষ কি একজনই থাকে?
অন্যদিকে এ সংঘর্ষের ঘটনায় নিহত ডেলিভারিম্যান নাহিদ মিয়ার হত্যাকারীকে শনাক্ত করা গেলেও দোকানকর্মী মো. মোরসালিনের খুনিদের এখনও শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। এ বিষয়ে যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, মোরসালিন হত্যা এখন পর্যন্ত ক্লুলেস। প্রাথমিকভাবে তথ্যপ্রমাণে এটাই নিশ্চিত হয়েছি যে, মোরসালিন ইটের আঘাতে মারা গেছেন। সুনির্দিষ্টভাবে ওই ইটটি কোথা থেকে এসেছে তা নির্দিষ্ট করা যায়নি। তবে যারা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেছে এবং এই ধরনের কাজে নেতৃত্ব দিয়েছে, তাদের দায়ভার বহন করতে হবে। যারা নেতৃত্ব দিয়েছে আমরা চেষ্টা করছি তাদের শনাক্ত করতে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নিউমার্কেটের সংঘর্ষের ঘটনায় দুজন তরুণ নিহত হন। এ ঘটনায় পৃথক দুটি মামলা ডিবিতে তদন্তাধীন। একটি নাহিদ হত্যায় এবং অন্য মামলাটি হয়েছে মোরসালিন হত্যার ঘটনায়। নাহিদ হত্যাকাণ্ডের যে ফুটেজ রয়েছে সেই ফুটেজের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে জড়িতদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। চিহ্নিতকরণের কাজটি অনেকদূর এগিয়েছে। চিহ্নিতদের মধ্যে ছাত্রলীগের কোনো নেতাকর্মী ছিল কি নাÑ সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে মাহবুব আলম বলেন, সেখানে ছাত্রলীগের কোনো কমিটি নেই। তবে যারা হেলমেট পরে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিল তারা সবাই সন্ত্রাসী। তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে।
অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ঢাকা কলেজের হোস্টেল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেকেই বাড়ি চলে গেছে অথবা আত্মগোপনে আছে। তবে ডিবির একাধিক টিম তাদের গ্রেফতারে চেষ্টা চালাচ্ছে। শিগগির এ বিষয়ে ভালো ফল জানানো হবে। এর আগে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, নাহিদ মিয়াকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যায় জড়িত ৬ ছাত্রকে শনাক্ত করা হয়েছে এবং তারা সবাই ঢাকা কলেজের। প্রত্যক্ষদর্শী এবং ভিডিও বিশ্লেষণ করে কয়েকজনের নাম ইতোমধ্যে সংবাদমাধ্যমের খবরে এসেছে। তারা সবাই ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের নেতাকর্মী।
অন্যদিকে নিউমার্কেট এলাকায় সংঘর্ষের মামলার আসামির তালিকায় মৃত এবং বিদেশে অবস্থানরত দুই কর্মীর নাম এসেছে বলে যে দাবি বিএনপি নেতাদের আইনজীবীর তরফ থেকে করা হয়েছে, সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে পুলিশ। নিউমার্কেট থানার ওসি স ম কাইয়ুম বলেন, পৃথিবীতে এক নামে মানুষ কি একজনই থাকে?
সংঘর্ষের সময় ‘দাঙ্গা-হাঙ্গামা, জ্বালাও-পোড়াও, পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার’ অভিযোগে নিউমার্কেট থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ইয়ামিন কবিরের দায়ের করা এ মামলায় ২৪ জনের নাম উল্লেখ করে আরও কয়েকশ ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থীকে আসামি করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত দুই ফাস্টফুড দোকানের বাকবিতণ্ডা থেকে সূত্রপাত হওয়া ঝামেলা গত ১৮ এপ্রিল রাত ১২টার দিকে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়। ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী ও দোকান কর্মচারীদের আড়াই ঘণ্টা ধরে চলে এ সংঘর্ষ। এরপর রাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলেও পরদিন ১৯ এপ্রিল বেলা ১১টার পর থেকে ফের দফায় দফায় শুরু হয় সংঘর্ষ, যা চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত। এ সংঘর্ষে দুজন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। এ ছাড়া সাংবাদিক-পুলিশসহ আহত হয়েছেন অন্তত অর্ধশতাধিক ব্যক্তি। এ ঘটনায় মোট ৪টি মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে সংঘর্ষের মামলায় নিউমার্কেট থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি মকবুল হোসেন ছাড়া আর কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।
বিএনপি নেতা মকবুল কারাগারে : নিউমার্কেটে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ব্যবসায়ী ও দোকান কর্মচারীদের সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে করা মামলায় বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট মকবুল হোসেনকে রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত।
বুধবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে আসামিকে তিন দিনের রিমান্ড শেষে হাজির করে পুলিশ।
এ সময় মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নিউমার্কেট থানার পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) হালদার অর্পিত ঠাকুর।
অন্যদিকে আসামি পক্ষে জামিনের প্রার্থনা করেন ঢাকা বারের সাবেক সভাপতি ইকবাল হোসেন। তবে তিনি জামিন শুনানি নিবেদন মতে বৃহস্পতিবার করার কথা জানান। শুনানি শেষে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইশরাত জাহান আসামিকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়ে জামিন শুনানির জন্য বৃহস্পতিবার দিন ধার্য করেন। এর আগে গত ২২ এপ্রিল বিকালে রাজধানীর ধানমন্ডির বাসা থেকে মকবুল হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়।
উল্লেখ্য গত ১৮ এপ্রিল রাত ১২টার দিকে ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী ও কর্মচারীদের সংঘর্ষ হয়। প্রায় আড়াই ঘণ্টা চলে এ সংঘর্ষ। এরপর রাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলেও ১৯ এপ্রিল সকাল ১০টার পর থেকে ফের দফায় দফায় শুরু হয় সংঘর্ষ, যা চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত। এ ঘটনায় উভয়পক্ষের অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হন। সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত দুজন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। তাদের একজন ডেলিভারিম্যান, অন্যজন দোকান কর্মচারী। ডেলিভারিম্যান নাহিদের নিহতের ঘটনায় তার বাবা মো. নাদিম হোসেন বাদী হয়ে নিউমার্কেট থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন। অন্যদিকে মুরসালিনের ভাই বাদী হয়ে আরও একটি হত্যা মামলা করেছেন। এ ছাড়া এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে এবং পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে দুটি মামলা করেন। দুই মামলায় নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী, কর্মচারী ও ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীসহ মোট ১২শ জনকে আসামি করা হয়েছে।