সৌদি আরবের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, করোনার প্রভাব, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, ভ্যাট-ট্যাক্স বৃদ্ধি, হজে ডেডিকেটেড হজ ফ্লাইটসহ নানা কারণে এবার বাড়ছে হজের খরচ। ইতোমধ্যে হজ ফ্লাইটের সর্বনিম্ন ভাড়া ধরা হয়েছে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা। এই ভাড়া সর্বশেষ ২০১৯ সালে নির্ধারণ করা ফ্লাইটের চেয়ে ১২ হাজার টাকা বেশি। এরপর করোনার কারণে দুবছর হজ বন্ধ রয়েছে। এ বছর হজ ফ্লাইট শুরুর সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ৩১ মে। মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, বিমান ভাড়া নির্ধারণ হয়ে গেছে।
এখন চূড়ান্ত হবে হজ প্যাকেজ। গত দুবছরে হজ সংশ্লিষ্ট প্রতিটি সেক্টরে খরচ বেড়েছে। গত ১৫ মাসে জেট ফুয়েলের দাম বেড়েছে ১১ বার, তাই বিমান ভাড়া বেড়েছে। অন্যান্য খরচ যতটুকু না বাড়ালেই নয় ততটুকু বাড়ানো হবে। ২০১৯ সালে প্যাকেজ-১-এর খরচ ছিল ৪ লাখ ১৮ হাজার ৫০০ টাকা। প্যাকেজ-২-এর খরচ হয় ৩ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। ২০২০ সালে হজ প্যাকেজ-১-এ ব্যয় ধরা হয় ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা। আর প্যাকেজ-২-এর ব্যয় ধরা হয় ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
হজ এজেন্সি মালিকদের সংগঠন হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব) প্রস্তাব করেছিল ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা। আর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স প্রস্তাব করেছিল দেড় লাখ টাকা।
বুধবার সচিবালয়ে হজ সংক্রান্ত একটি সভা হয়। সেখানে হাব ও বিমানের দেওয়া প্রস্তাবসহ নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা শেষে বিমান প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী বলেন, ৩১ মে প্রথম ফ্লাইট হবে- এ ধারণা থেকে আমরা আলোচনায় বসেছি। এর মধ্যেই যাতে সব কাজ শেষ করতে পারি, এজন্য সবাই বসে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমাদের (বিমানের) ডেডিকেটেড ফ্লাইট থাকবে ৭৫টি। বহরের সবচেয়ে বড় উড়োজাহাজ বোয়িং ট্রিপল সেভেনকে ডেডিকেটেড ফ্লাইট হিসেবে নেব।
তিনি বলেন, ২০১৯ থেকে আমরা সৌদি সরকারের সঙ্গে অনেকগুলো প্রাগমেটিক স্টেপ নিয়েছি। বিশেষ করে বাংলাদেশে যাত্রীদের ইমিগ্রেশন শেষ করা। আমি সৌদি সরকারকে ধন্যবাদ জানাই, কারণ তারা এখানে ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করার বিষয়ে যথেষ্ট সহযোগিতা করেছে। আশা করি এ বছর আরও সহযোগিতা বাড়াবে। আমাদের দিক থেকে যত প্রস্তুতি প্রয়োজন আমরা অল্প সময়ে এগুলো নেব।
হাব বলছে, যেহেতু বিমান ভাড়া বেড়েছে, পুরো হজ প্যাকেজের মূল্যও বাড়বে। বিমান ভাড়া বাড়লে হজযাত্রীদের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এজন্য প্রতিবছরই হজের মৌসুমে আলোচনায় থাকে হজযাত্রীদের বিমান ভাড়া।
দুটি দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত হজ চুক্তি অনুসারে ২০১২ সাল থেকে হজ যাত্রীদের পরিবহন করছে শুধু জাতীয় পতাকাবাহী বিমান এবং সউদিয়া এয়ারলাইন্স। এর আগে অনেকগুলো এয়ারলাইন্স হজযাত্রী পরিবহনের সুযোগ পেত।
গত কয়েক বছর ধরে এই দুই এয়ারলাইন্সের ‘একচেটিয়া ব্যবসা’ বন্ধ করে ‘প্রতিযোগিতামূলক ভাড়ার পরিবেশ সৃষ্টি করতে’ অন্যান্য এয়ারলাইন্সকে হজ যাত্রী পরিবহনের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে হজ এজেন্সিগুলো।
শুধু তাই নয়, এজন্য আইনি লড়াইও চালিয়ে যাচ্ছে হাব। হাব বলছে, শুধু বিমান ও সৌদি এয়ারলাইন্স হজের যাত্রী পরিবহনের সুযোগ পাওয়ায় তারা ইচ্ছামতো ভাড়া নির্ধারণ করে। থার্ড ক্যারিয়ার চালুর জন্য ২০১৩ সালে রিট পিটিশন করলে হাইকোর্ট থার্ড ক্যারিয়ার চালু করার নির্দেশনা দিয়ে রায় দেন। হাইকোর্টের রায় কার্যকর না করে সরকার সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে হাইকোর্টের রায় স্থগিতের আবেদন করে। সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে বিষয়টি শুনানি হয় এবং দীর্ঘ শুনানি শেষে আপিল বিভাগও ২০১৬ সালের ৮ ডিসেম্বর হজযাত্রী পরিবহনে থার্ড ক্যারিয়ার চালু করার নির্দেশ দেন। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে সেই রায় এখনও বাস্তবায়ন হয়নি।
এবার বাংলাদেশ থেকে ৫৭ হাজার ৮৫৬ জন হজে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে ৬৫ বছরের বেশি বয়সিরা এ বছর হজে যেতে পারবেন না। ২০১৯ সালে প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার বাংলাদেশিকে হজ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (হাব) সভাপতি এম শাহাদাত হোসাইন তসলিম সময়ের আলোকে বলেন, ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা ভাড়া নির্ধারণ করা ঠিক হয়নি। আমরা ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা প্রস্তাব করেছিলাম। বিমান ভাড়া বাড়ায় হজ প্যাকেজের মূল্যও বাড়বে। যাত্রীদের ওপর চাপ সৃষ্টি হবে। হজ পালন করতে একজন হজযাত্রীর যে খরচ হয়, তার বড় অংশ চলে যায় বিমান ভাড়ায়। স্বাভাবিক সময়ে সৌদি আরব যাওয়া-আসার বিমান ভাড়া ৮৮ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার মধ্যেই থাকে। কিন্তু হজের সময়ে এসে এই ভাড়া আরও বাড়ানো হয়।
তিনি বলেন, দুটি এয়ারলাইন্সের পরিবর্তে অন্য আরও এয়ারলাইন্স হজযাত্রী পরিবহন করলে একচেটিয়া ভাড়ার পরিবর্তে প্রতিযোগিতামূলক ভাড়া নির্ধারণ হবে। প্রতিবছরই অযৌক্তিকভাবে ভাড়া বাড়ানো হয়। তিনি বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে তৃতীয় ক্যারিয়ারের দাবি জানিয়ে আসছি, কারণ বিমান এবং সউদিয়া হাজীদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ বিমান ভাড়া নেয়। পাশাপাশি দুটি এয়ারলাইন্স অন্য বিভিন্ন ফি নেয়।
ধর্ম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মো. ফরিদুল হক খান বলেন, ‘হজের অনেকগুলো বিষয় সৌদি আরবের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। কোনো সমস্যা থাকলে আমরা সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে সমাধান করব।’