ঢাকা ০২:২১ অপরাহ্ন, রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬, ১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

অভিনন্দন মোহন দাদা – নুরুন্নবী সোহেল

  • Reporter Name
  • আপডেট সময় ০৭:৫৮:০৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৫৯৯ বার পড়া হয়েছে

অভিনন্দন মোহন দাদা
-নুরুন্নবী সোহেল

৮৪ সালের সেই দিনগুলো এখন মনে হলে মনে হয়, যেন অন্য এক ঋতু ছিল জীবনে। ৪১ নম্বর এনায়েতগঞ্জের বাসাটা শুধু একটা ঠিকানা ছিল না, ছিল আমাদের দৌড়ঝাঁপের রাজ্য। গেট থাকলেও আমরা গেট মানতাম না। পাঁচিল টপকে ঢোকার মধ্যে যে স্বাধীনতার স্বাদ ছিল, তা আর কোথাও পাইনি। সরু গলি পেরিয়ে ছোট উঠান, তারপর সিঁড়ি—সবকিছু আজও স্পষ্ট।
সেদিন সকাল দশটার দিকে মোস্তফাকে ডাকতে গিয়ে প্রথম দেখলাম তাকে। লম্বা, ফর্সা, ঝাঁকড়া চুল, সাদা শার্টে এক অদ্ভুত দীপ্তি। মোস্তফা বলল, “এ আমার দাদা, মোহন।” সেই এক মুহূর্তেই নামের সঙ্গে একটা আলাদা দৃঢ়তা জড়িয়ে গেল। এভাবেই শুরু আমার আর মোহন রায়হান-এর পরিচয়।
তার ঘরে একদিন দেখি কয়েকজন বসে পোস্টার লিখছে। আমি চুপচাপ পরদা সরিয়ে দাঁড়াতেই তিনি হাসলেন। বললেন, “এসো, তোমাকে মশাল আঁকা শিখাই।” সেই মশাল ছিল কাগজে আঁকা, কিন্তু তার আগুন ছিল ভেতরে। সেদিন থেকে বুঝলাম, কবিতা শুধু লেখা হয় না, বাঁচা হয়।
ঢাকা কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মিছিলগুলোতে তাকে দেখেছি সামনে হাঁটতে। কণ্ঠে দৃঢ়তা, চোখে আগুন। এক বিকেলে আমতলার পথে হঠাৎ পেছন থেকে ডাক। ফিরে দেখি রিকশায় দাদা। পাশে বসে আছেন চাপদাড়ি, বড় চুলের এক তীব্রদৃষ্টির মানুষ। পরিচয় করিয়ে দিলেন—রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। টি.এস.সি-র সিঁড়ির নিচে বসে সেদিন আমরা ঠিক করলাম, কবিতা যদি উৎসব হয়, তবে সে হবে প্রতিরোধের উৎসব।
সেইভাবেই জন্ম নিল জাতীয় কবিতা পরিষদ-এর পথচলা। পুলিশ মঞ্চ ভেঙেছে, আমরা ভাঙা কাঠ জোড়া দিয়ে আবার দাঁড় করিয়েছি। দুদিন ঘুম হয়নি, বাসায় ফেরা হয়নি। তবু ক্লান্ত লাগেনি। মনে হতো, শব্দেরও রক্ত থাকে।
সময় বদলেছে। রাজনীতির পথ ঘুরেছে। কাছের মানুষ দূরে গেছে, দূরের মানুষ কাছে এসেছে। তবু বাংলাবাজারের প্রেস, কাটাবনের গলি, পল্টনের নতুন অফিস—সবখানেই সেই চেনা হাসি, চেনা স্বপ্ন। কত রাত, কত কবিতা, কত পরিকল্পনা—সব মিলিয়ে এক দীর্ঘ যাত্রা।
আজ দুপুরে খবর এল—মোহন ভাই পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার। খবরটা শুনে মনে হলো, বহুদিনের জমে থাকা পরিশ্রম হঠাৎ আলোয় ভেসে উঠেছে। এই স্বীকৃতি শুধু একজন কবির নয়, আমাদের তরুণ দিনের সাহসেরও।
ভাবি, পাঁচিল টপকে যে কিশোর ঢুকত বন্ধুর বাসায়, সে কি জানত একদিন কবিতা তাকে নিয়ে যাবে সংগ্রামের মঞ্চে, ইতিহাসের পাশে দাঁড় করাবে?
আজ মন ভরে আছে এক শান্ত আনন্দে।
মোহন দাদা, আপনার পথচলা আমাদের স্মৃতির ভেতর জ্বলা মশাল হয়ে থাকবে।
শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা রইল।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

CrimeNews Media24

জনপ্রিয় সংবাদ

অভিনন্দন মোহন দাদা – নুরুন্নবী সোহেল

আপডেট সময় ০৭:৫৮:০৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

অভিনন্দন মোহন দাদা
-নুরুন্নবী সোহেল

৮৪ সালের সেই দিনগুলো এখন মনে হলে মনে হয়, যেন অন্য এক ঋতু ছিল জীবনে। ৪১ নম্বর এনায়েতগঞ্জের বাসাটা শুধু একটা ঠিকানা ছিল না, ছিল আমাদের দৌড়ঝাঁপের রাজ্য। গেট থাকলেও আমরা গেট মানতাম না। পাঁচিল টপকে ঢোকার মধ্যে যে স্বাধীনতার স্বাদ ছিল, তা আর কোথাও পাইনি। সরু গলি পেরিয়ে ছোট উঠান, তারপর সিঁড়ি—সবকিছু আজও স্পষ্ট।
সেদিন সকাল দশটার দিকে মোস্তফাকে ডাকতে গিয়ে প্রথম দেখলাম তাকে। লম্বা, ফর্সা, ঝাঁকড়া চুল, সাদা শার্টে এক অদ্ভুত দীপ্তি। মোস্তফা বলল, “এ আমার দাদা, মোহন।” সেই এক মুহূর্তেই নামের সঙ্গে একটা আলাদা দৃঢ়তা জড়িয়ে গেল। এভাবেই শুরু আমার আর মোহন রায়হান-এর পরিচয়।
তার ঘরে একদিন দেখি কয়েকজন বসে পোস্টার লিখছে। আমি চুপচাপ পরদা সরিয়ে দাঁড়াতেই তিনি হাসলেন। বললেন, “এসো, তোমাকে মশাল আঁকা শিখাই।” সেই মশাল ছিল কাগজে আঁকা, কিন্তু তার আগুন ছিল ভেতরে। সেদিন থেকে বুঝলাম, কবিতা শুধু লেখা হয় না, বাঁচা হয়।
ঢাকা কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মিছিলগুলোতে তাকে দেখেছি সামনে হাঁটতে। কণ্ঠে দৃঢ়তা, চোখে আগুন। এক বিকেলে আমতলার পথে হঠাৎ পেছন থেকে ডাক। ফিরে দেখি রিকশায় দাদা। পাশে বসে আছেন চাপদাড়ি, বড় চুলের এক তীব্রদৃষ্টির মানুষ। পরিচয় করিয়ে দিলেন—রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। টি.এস.সি-র সিঁড়ির নিচে বসে সেদিন আমরা ঠিক করলাম, কবিতা যদি উৎসব হয়, তবে সে হবে প্রতিরোধের উৎসব।
সেইভাবেই জন্ম নিল জাতীয় কবিতা পরিষদ-এর পথচলা। পুলিশ মঞ্চ ভেঙেছে, আমরা ভাঙা কাঠ জোড়া দিয়ে আবার দাঁড় করিয়েছি। দুদিন ঘুম হয়নি, বাসায় ফেরা হয়নি। তবু ক্লান্ত লাগেনি। মনে হতো, শব্দেরও রক্ত থাকে।
সময় বদলেছে। রাজনীতির পথ ঘুরেছে। কাছের মানুষ দূরে গেছে, দূরের মানুষ কাছে এসেছে। তবু বাংলাবাজারের প্রেস, কাটাবনের গলি, পল্টনের নতুন অফিস—সবখানেই সেই চেনা হাসি, চেনা স্বপ্ন। কত রাত, কত কবিতা, কত পরিকল্পনা—সব মিলিয়ে এক দীর্ঘ যাত্রা।
আজ দুপুরে খবর এল—মোহন ভাই পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার। খবরটা শুনে মনে হলো, বহুদিনের জমে থাকা পরিশ্রম হঠাৎ আলোয় ভেসে উঠেছে। এই স্বীকৃতি শুধু একজন কবির নয়, আমাদের তরুণ দিনের সাহসেরও।
ভাবি, পাঁচিল টপকে যে কিশোর ঢুকত বন্ধুর বাসায়, সে কি জানত একদিন কবিতা তাকে নিয়ে যাবে সংগ্রামের মঞ্চে, ইতিহাসের পাশে দাঁড় করাবে?
আজ মন ভরে আছে এক শান্ত আনন্দে।
মোহন দাদা, আপনার পথচলা আমাদের স্মৃতির ভেতর জ্বলা মশাল হয়ে থাকবে।
শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা রইল।