সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও প্রত্যয়ের পূর্ণতায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল,
নুরুন্নবী সোহেল
কিছু পথ কেবল পায়ের নিচে তৈরি হয় না, তৈরি হয় মানুষের বুকের ভেতর। সেই পথের প্রতিটি বাঁকে জমে থাকে সময়ের উত্তাপ, অপেক্ষার দীর্ঘশ্বাস, আনন্দের উচ্ছ্বাস আর বেদনার নীরব নদী। কোনো কোনো রাজনৈতিক যাত্রার ইতিহাসও তাই কেবল তারিখ, ঘটনা কিংবা স্লোগানের সমষ্টি নয়; তা হয়ে ওঠে মানুষের আশা, আকাঙ্ক্ষা, বিশ্বাস ও আত্মত্যাগের দীর্ঘ প্রতিচ্ছবি।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলাকেও দেখা যায় সেই বৃহত্তর অভিজ্ঞতার আলোকে। এই পথ কখনো মসৃণ ছিল না। এসেছে প্রতিকূলতা, এসেছে সংকট, এসেছে ভাঙন ও পুনর্গঠনের সময়। কিন্তু প্রতিটি অন্ধকারের ভেতর থেকেই জন্ম নিয়েছে নতুন প্রত্যয়ের আলো।
সংগ্রাম এখানে শুধু রাজপথের মিছিল নয়। সংগ্রাম কখনো মানুষের অন্তর্গত বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে থাকার নাম, কখনো প্রতিকূল সময়ের সামনে মাথা নত না করার সাহস। কখনো তা নিঃশব্দ অপেক্ষা, আবার কখনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে উচ্চারিত একটি কণ্ঠ।
আপসহীনতার অর্থও কেবল কঠোরতা নয়। বরং ঝড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে নিজের শিকড়কে চিনে নেওয়া। সময় যখন বিশ্বাসকে পরীক্ষা নেয়, তখন যে আদর্শ মানুষকে আবারও নিজের কাছে ফিরিয়ে আনে, সেই প্রত্যয়ের নামই আপসহীনতা।
দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রায় আত্মত্যাগের অধ্যায়গুলো সবচেয়ে গভীর। কত মানুষ তাদের সময় দিয়েছে, শ্রম দিয়েছে, স্বপ্ন দিয়েছে; কেউ হারিয়েছে প্রিয়জন, কেউ সহ্য করেছে নিপীড়ন, কেউ আবার নিজের জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল সময়টুকু উৎসর্গ করেছে একটি রাজনৈতিক বিশ্বাসের পেছনে। ইতিহাসের পাতায় হয়তো সব নাম লেখা থাকে না, কিন্তু মানুষের স্মৃতিতে সেই ত্যাগের প্রতিধ্বনি থেকে যায়।
এই কারণেই কোনো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠার আনন্দকে কেবল উৎসবের আলো দিয়ে দেখা যায় না। তার ভেতরে থাকে বহু অন্ধকার রাতের গল্প। থাকে পরাজয়ের বেদনা, আবার উঠে দাঁড়ানোর সাহস। থাকে অশ্রু, আবার থাকে বিজয়ের হাসি। থাকে হারানোর শূন্যতা, আবার নতুন স্বপ্নের জন্ম।
একটি পতাকা তাই কখনো শুধু কাপড়ের তৈরি প্রতীক নয়। তার ভাঁজে ভাঁজে জমে থাকে মানুষের আবেগ, প্রত্যাশা ও সংগ্রামের স্মৃতি। একটি স্লোগানও কেবল উচ্চারিত কিছু শব্দ নয়; সময়ের নির্দিষ্ট মুহূর্তে তা হয়ে উঠতে পারে মানুষের আকাঙ্ক্ষার ভাষা।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের দীর্ঘ পথচলার দিকে ফিরে তাকালে তাই দেখা যায় আনন্দ-বেদনার এক বহমান ইতিহাস। সেখানে যেমন আছে রাজনৈতিক সাফল্যের অধ্যায়, তেমনি আছে কঠিন সময়ের স্মৃতি। আছে বিচ্ছেদ, আছে প্রত্যাবর্তন; আছে হতাশা, আবার আছে নতুন করে স্বপ্ন দেখার শক্তি।
শেষ পর্যন্ত ইতিহাস কোনো স্থির নদী নয়। সে প্রতিনিয়ত তার গতিপথ বদলায়। এক প্রজন্মের স্বপ্ন অন্য প্রজন্মের হাতে গিয়ে নতুন অর্থ পায়। পুরোনো সংগ্রামের স্মৃতি নতুন দিনের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়।
তাই দীর্ঘ লড়াইয়ের পূর্ণতা মানে কেবল কোনো একটি গন্তব্যে পৌঁছে যাওয়া নয়। পূর্ণতা হলো সংগ্রামের অভিজ্ঞতা থেকে ভবিষ্যতের পথ চিনে নেওয়া। আত্মত্যাগকে স্মৃতিতে ধারণ করে মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার দিকে এগিয়ে যাওয়া।
কারণ কিছু স্বপ্ন সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয় না।
তারা মানুষের ভেতরে বেঁচে থাকে,
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে আলো হয়ে যায়।
আর কিছু পথের শেষ নেই।
একটি প্রজন্ম যেখানে থামে,
অন্য একটি প্রজন্ম সেখান থেকেই
আবার হাঁটা শুরু করে।
নুরুন্নবী সোহেল 























