স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার কেন্দ্রীয় স্লোগান যখন ‘সেবা এখন হাতের মুঠোয়’, তখন কুমিল্লার তিতাস উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদগুলোর সরকারি ওয়েবসাইটগুলো যেন এক একটি ‘ডিজিটাল কঙ্কাল’।
আমাদের দীর্ঘ অনুসন্ধান ডিজিটাল জরিপ ও ভিডিও ফুটেজে উঠে এসেছে ভয়াবহ এক অব্যবস্থাপনার চিত্র। যেখানে পোর্টালে তথ্যের বদলে মিলছে শূন্যতা, আর রক্ষণাবেক্ষণের নামে প্রতি বছর লোপাট হচ্ছে সরকারি অর্থ।
১. ডিজিটাল স্থবিরতা: ভুতুড়ে তথ্য বাতায়ন
তিতাস উপজেলা প্রশাসনের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট (
titas.comilla.gov.bd) ভিজিট করে দেখা গেছে, এটি এখন কেবল একটি শো-পিস।
* কর্মকর্তাদের হদিস নেই: ভিডিও রেকর্ডে দেখা যায়, সাইটে এখনো এমন সব কর্মকর্তার নাম ও ফোন নম্বর ঝুলছে যারা ৩-৪ বছর আগেই বদলি হয়ে গেছেন। জরুরি প্রয়োজনে সাধারণ মানুষ কল করে পাচ্ছেন না কাঙ্ক্ষিত সেবা।
* নিরাপত্তাহীন সরকারি সাইট: অধিকাংশ দাপ্তরিক লিংকে ক্লিক করলে ‘Connection is not private’ এরর দেখাচ্ছে। এতে করে সাধারণ ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য হ্যাক হওয়ার চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
২. ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার: সেবার নামে শুভঙ্করের ফাঁকি
উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের ওপর চালানো অনুসন্ধানে দেখা গেছে এক চরম উদাসীনতার চিত্র:
* তথ্যশূন্য পোর্টাল: ভিটিকান্দি, মজিদপুর ও জগৎপুর ইউনিয়নের সাইটগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ লিংকেই “কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি”। অথচ ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিটি প্রকল্পের তথ্য অনলাইনে থাকা বাধ্যতামূলক।
* জিয়ারকান্দি ইউনিয়ন ব্যতিক্রম: জরিপে একমাত্র ৮নং জিয়ারকান্দি ইউনিয়নের সাইটটি কিছু তথ্যসহ সচল পাওয়া গেছে, যা প্রমাণ করে ইচ্ছা থাকলে সেবা দেওয়া সম্ভব।
৩. ব্যয়ের খতিয়ান: রক্ষণাবেক্ষণের টাকা গেল কার পেটে?
জাতীয় তথ্য বাতায়নের কাঠামো অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রতিটি উপজেলা পোর্টাল ও ইনোভেশন খাতে নির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ থাকে। গত ৩ বছরে তিতাস উপজেলায় আইটি রক্ষণাবেক্ষণ ও ডাটা এন্ট্রি বাবদ যে পরিমাণ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে, তার ১ শতাংশও সাইটের উন্নয়নে ব্যবহৃত হয়নি।
যদি সাইটে কোনো তথ্যই আপডেট না হয়, তবে ‘ইনোভেশন’ ও ‘রক্ষণাবেক্ষণ’ খাতের লাখ লাখ টাকা কোথায় খরচ হলো? এটি সরাসরি সরকারি অর্থের অপব্যবহার এবং ডিজিটাল জালিয়াতি বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
৪. প্রশাসনের রহস্যজনক নিরবতা
এই ডিজিটাল স্থবিরতা, জনভোগান্তি এবং বাজেট সংশ্লিষ্ট গুরুতর অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে তিতাস উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও)-কে ইমেইল ও ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে এবং উপজেলা প্রশাসনের অফিসিয়াল ‘প্রেস রিলিজ’ গ্রুপে লিখিত প্রশ্ন (Press Query) পাঠানো হয়েছিল। ইউএনও-র ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজগুলো সফলভাবে ডেলিভারড (দুই দাগ) হলেও তিনি তা দেখার বা কোনো উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করেননি।
এমনকি প্রশাসনের অফিশিয়াল গ্রুপেও কোনো প্রতিক্রিয়া মেলেনি। নির্ধারিত সময়সীমা পার হওয়ার পরও প্রশাসনের এই নিরবতা জনমনে ক্ষোভ এবং দুর্নীতির অভিযোগকে আরও জোরালো করছে।
৫. আইনি বেড়াজালে প্রশাসন
‘তথ্য অধিকার আইন ২০০৯’ অনুযায়ী সরকারি তথ্য জনগণের কাছে উন্মুক্ত রাখা বাধ্যতামূলক।
তিতাস উপজেলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এই আইনের তোয়াক্কা না করে ডিজিটাল জালিয়াতির আশ্রয় নিচ্ছেন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পোর্টালে তথ্য না পেয়ে মানুষ সরাসরি অফিসে এসে দালালের খপ্পরে পড়ছেন। ঘরে বসেই যা সমাধান সম্ভব ছিল, তার জন্য এখন গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা।
তদন্তের দাবি:
এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর নাগরিক সমাজের দাবি—অবিলম্বে আইসিটি বিভাগ এবং উচ্চতর প্রশাসন যেন তিতাস উপজেলার এই ডিজিটাল অনিয়মের সুষ্ঠু তদন্ত শুরু করে।
প্রতিবেদকের চ্যালেঞ্জ: আমরা আমাদের প্রতিটি দাবির সপক্ষে ভিডিও প্রমাণাদি ডিজিটাল ফরম্যাটে সংরক্ষণ করেছি, যা যেকোনো তদন্ত কমিটির কাছে জমা দিতে প্রস্তুত।