ভোজ্য তেলের দাম ও সঙ্কট নিয়ে চারদিকে চলছে আলোচনা আর সমালোচনা। তেল নিয়ে যেন তেলেসমাতি কারবার চলছে। কিন্তু এর কারণ কী- সে প্রশ্নটিই ঘুরপাক খাচ্ছে সবার মধ্যে। মালিবাগ বাজারের কয়েকজন মুদি দোকানদারের প্রশ্ন- কোথায় গেল সয়াবিন তেল? আর দামই বা এত বাড়ল কেন। রোববার ফেনী থেকে ঈদের ছুটি শেষে নিজ কর্মস্থলে যোগদান করেছেন সরকারি এক কর্মচারী। তারও অভিযোগ তার গ্রামে সয়াবিন তেলের জন্য হাহাকার চলছে; কিন্তু কেন এই সঙ্কট- এ প্রশ্ন করে কারও কাছ থেকে কোনো সদুত্তর পাননি তিনি।
ভোক্তারা মনে করেছিলেন রমজান মাসে ভোজ্যতেলের চাহিদা বেশি থাকায় হয়তো দাম বেড়েছে। কিন্তু রমজান শেষে ঈদ গেল। কোথায় দাম কমবে, তা নয়, দাম আরও বাড়ল। শুধু কি তাই বাজার থেকে সয়াবিন উধাও হয়ে গেল।
এ সংকটের উৎসের সন্ধানে নেমেছে সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা। গোয়েন্দারা মিল মালিকদের সঙ্গে আলাপের পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, গোয়েন্দা সংস্থা তাদের কাছে সয়াবিন তেলের মজুদ থেকে শুরু করে সরবরাহের পরিমাণসহ আন্তর্জাতিক দামের তথ্য চেয়েছেন।
তথ্য অনুয়ায়ী বাংলাদেশে বর্তমানে সয়াবিনের যে দাম এর চেয়ে ভারত, নেপাল ও পাকিস্তানেও দাম বেশি। ভারতে এক লিটার ১৯০ থেকে ২০০ রুপি, যার বাংলাদেশের রূপান্তরিত মূল্য ২১৩ থেকে ২২৪ টাকা। পাকিস্তানে লিটারপ্রতি ৫১০ থেকে ৫১৪ রুপি, যার বাংলাদেশে রূপান্তরিত মূল্য ২৩৬ থেকে ২৩৮ টাকা। আর নেপালে প্রতি লিটার রুপিয়া ২৮০ থেকে ৩০৪, যার বাংলাদেশের রূপান্তরিত মূল্য ১৯৭ থেকে ২১৫ টাকা।
সার্কভুক্ত দেশের মধ্যে এখনও বাংলাদেশে সয়াবিনের মূল্য তুলনামূলকভাবে কম বলে দাবি করেছেন ট্যারিফ কমিশনের মো. মাহমুদুল হাসান। তিনি নিত্যপণ্যের মূল্য নিয়ে গবেষণা করে থাকেন বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা দামের চেয়ে সঙ্কটের বিষয়টিতে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে আভাস পাওয়া গেছে। জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদফতরের সঙ্গে তারা যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। কারণ মাসে গড়ে সয়াবিন তেলের চাহিদা রয়েছে ১ লাখ ৩০ থেকে ৪০ হাজার মেট্রিক টন। রমজান মাসে এ চাহিদা বেশ কিছুটা বৃদ্ধি পায়। কিন্তু রমজানের পর কেন সঙ্কট হলো, এ নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। সরবরাহ চেইন কোথায় কোথায় ব্যাহত হয়েছে তা পরখ করতে চায় গোয়েন্দা সংস্থা। শুধু তাই নয়, এ বিষয়ে সরকারের কাছে বেশ কিছু সুপারিশ রাখা হবে বলে আভাস পাওয়া গেছে। তবে কী ধরনের সুপারিশ রাখা হবে সে বিষয়ে খোলাসা না করা হলেও সয়াবিনের বিকল্প তেল ব্যবহারে উৎসাহিত করতে শুল্ক ছাড়সহ আরও কিছু বিষয় থাকতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত শনিবার গণভবনে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের স্বাগত বক্তব্যে সয়াবিনের বিকল্প বাদাম তেলসহ অন্যান্য তেলের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। এর আগে তিনি একনেকের এক সভায় সরিষা চাষের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। অর্থাৎ আমদানিনির্ভর না হয়ে দেশে উৎপাদনের দিকে মনোযোগ বাড়ানোর নির্দেশনা দেন।
ট্যারিফ কমিশনের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, ইন্দোনেশিয়া যখন পামঅয়েল রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করল, তখনই সরকারের কাছে ট্যারিফ নিয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কারণ ইন্দোনেশিয়া রফতানি নিষেধ কার্যকর করার সঙ্গে সঙ্গে সয়াবিন তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে বেড়ে যায়। কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। বাড়ানো না হলে সয়াবিনের সঙ্কট আরও ঘনীভূত হতো। কারণ কোনো মিল মালিক লস দিয়ে তেল আর সরবরাহ করত না।
অন্যদিকে আজ থেকে সয়াবিনের সঙ্কট কাটবে বলে আশ্বস্ত করেছে ট্যারিফ কমিশন। একই সঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অন্য এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বাজার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে মনিটর করা হচ্ছে। আজ সোমবার থেকে সয়াবিনের সরবরাহ বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করি।
এরপরও সঙ্কটের উৎস সন্ধানে পিছু ছাড়ছে না গোয়েন্দা সংস্থা।